মধ্যবিত্ত

“আমি” শব্দটা খুব ছোট। কিন্তু, এই শব্দটার ব্যখ্যাটা সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল জিনিস। কেননা “আমি” শব্দটির সাথে জড়িয়ে থাকে একান্ত কাছের মানুষগুলো, আশেপাশের মানুষগুলো, এমনকি মানুষগুলোর সেই জীবনের সাথে তাদের জীবিকা, ভালোলাগা, খারাপ-লাগা, তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অবস্থা এবং বিশেষত, তাদের মানসিকতা। তাইতো আজকের “আমি” অর্থই হল অতীত এবং বর্তমানের নিজের এবং পরিবারের সার্বিক অবস্থা এবং অবস্থানের যোগফল।

যাই হোক, কখনো কখনো সব মিলিয়ে চলার পথের দূরের কোন মানুষকে দেখলে অথবা আচমকা কারো সাথে চলতে চলতে যখন নিজের অজান্তেই তাদের জীবনের সমীকরণের সাথে নিজের সমীকরণটা এক করার চেষ্টা করি তখনই নিজের আসল অবস্থানটা খুব বেশি প্রতিভাত হয়ে যায়। সেই সাথে কখনোবা অনেক অনেক আনন্দ হয় আবার কখনো কখনো মনটা ভরে ওঠে প্রচন্ড কষ্টে। এমন কষ্ট কারো একার নয়; সবারই জীবনে থাকে এমন কষ্ট, যেগুলির অধিকাংশই আমাদেরকে হাসিমুখে চেপে যেতে হয় সবার কাছ থেকে;  এমনকি আপন জনের কাছ থেকেও, কখনো বা নিজের কাছ থেকেও। আর নিজের সাথে নিজেকে প্রবঞ্চনা করা এই মানুষগুলো যারা সারাটা জীবন কাটিয়ে দেয় কিছু পাওয়া আর কিছু না পাওয়ার মাঝামাঝি তারা সমাজের দৃষ্টিতে হল “মধ্যবিত্ত”।

মধ্যবিত্ত মানুষগুলো যেমন অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের মানসিকতার মাধ্যমে জীবনটাকে সার্থক করে তুলতে পারে তেমনি শুধুমাত্র দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্নতার কারণে সেই মধ্যবিত্ত জীবনটা হয়ে ওঠে অনেক বেশি দুঃসহ। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো কখনো তাদের পুরো স্বপ্নকে বাস্তব হিসাবে পায়না বলেই সারাটা জীবন থাকে এক ধরণের অপূর্ণতা। এই অপূর্ণতা যখন অতৃপ্তি হিসাবে ধরা দেয় তখন তা হয়ে দাঁড়ায় মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর জন্য জীবন-যন্ত্রনা। আর যে মধ্যবিত্ত মানুষগুলো সমাজের সবচেয়ে দুঃখী, দরিদ্র সেই মানুষগুলো যাদের কাছে জীবনের অর্থই হল শুধুই খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা তাদের কঠিন থেকে কঠিনতর জীবন-সংগ্রামের দিকে তাকিয়ে নিজেদের অর্জনগুলোকে অনেক অনেক বড় করে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন তারা জীবনটাকে সবচেয়ে আনন্দময় করে উপলব্ধি করতে পারেন।

সম্ভবত মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর জীবনের পাওয়া, না-পাওয়ার দ্বন্দ্ব জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষগুলোকে একই বৃত্তের মধ্যেই বারে বারে ঘোরাফেরা করাতে বাধ্য করে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাবা-মা’রা তাদের জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়ে দেন সন্তানের সম্ভব সবটুকু ভালো করার জন্য, সন্তানের সবটুকু সুখের জন্য। আর সেই সন্তানরাও চেষ্ট করে তাদের পিতামাতাকে সম্ভব সবটুকু খুশী করার জন্য। বাবা-মা তাদের ইচ্ছাগুলোকে বিসর্জন দেন সন্তানের ইচ্ছাপূরণের জন্য। নিজের ভালো কিছু খাবার ইচ্ছা হলেও সেটাকে বাদ দিয়ে সন্তানের পছন্দের খাবার কিনতে তারা বেশি আনন্দ পান; ঈদ অথবা কোন উৎসবে নিজে কম দামের পোষাক কিনে সন্তানের জন্য সাধ্যের সবচেয়ে ভালো পোষাকটা কিনেন, নিজের প্রসাধনী না কিনে সন্তানের খেলনা কিনে আনন্দ পান। নিজে পায়ে হেঁটে পথ চলে সন্তানকে রিক্সা অথবা অন্য কোন যানবাহনে পথচলার সূযোগ করে দেন, নিজে সযত্নে মুখভরা হাসিতে লুকিয়ে রাখেন বুক ভরা কান্না। বাসার সমস্ত কাজ নিজের হাতে করে চেষ্টা করেন কিছু অর্থ সাশ্রয়ের। অবসরের সময়টুকুতে হয়ত বসেন হিসাবের খাতা নিয়ে কিভাবে সংসারের খরচটা আরো কিছুটা কমানো যায়; কিভাবে সন্তানকে সেই সাশ্রয় করা অর্থে কোন উপহার দেওয়া যায়। সন্তানের সাধ পুরণে সাধ্যের বাইরে যেয়েও চেষ্টা করেন প্রতিনিয়ত।

তারপরও এতো চিন্তা, এতো স্বপ্ন, এতো প্রত্যাশার পূরণে সহ্য করে যাওয়া কষ্ট, দুঃখ, বেদনা, আত্মত্যাগের সাথে অনেক অনেক ব্যবধান রয়ে যায় বাস্তবতার। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা ছোট বেলা থেকেই যখন বেড়ে ওঠে এমন একটি পরিবেশে যেখানে তারা অনুভব করে সন্তানের প্রতি বাবা-মা’র ত্যাগ, বাবা-মায়ের স্নেহ, আকুলতা আর ভালোবাসার গভীরতা। স্কুল ড্রেসটি অনেক পুরানো না হওয়া পর্যন্ত অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানই বাবা-মা’কে মুখ ফুটে বলে না, যে তার নতুন ড্রেস প্রয়োজন। কিন্তু, তারপরও যখন নতুন একটা ড্রেস তার সামনে বাবা-মা হাসিমুখে নিয়ে আসে, তখন যত কম দামেরই হোক না কেন, সেটা পাবার পর সন্তানের যে আনন্দ তার সাথে কিন্তু সারা পৃথিবীর কোন কিছুরই তুলনা হয় না।

স্কুলের কোন সহপাঠী যখন হাতে খুব সুন্দর একটা ঘড়ি পরে আসে, নতুবা দামী গাড়ী চড়ে আসে; অথবা তাদের জন্মদিনে ক্লাসের সবাইকে দামী চকলেট খাওয়ায়, নতুবা খেলাধূলার সময় ঝকমকে পোষাক পরে আসে, তখন মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকে ছেলে-মেয়েরই কষ্ট হয় সেটা সত্যি, মনের ভিতরে ছোট্ট করে হলেও কেমন একটা ব্যাথা হয় সেটাও সত্যি, কিন্তু, সে দুঃখবোধটা খুবই সাময়িক; ক্ষণস্থায়ী। যখন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটি মায়ের হাতে খাবার খেয়ে বাবা অথবা মায়েরই হাত ধরে এমনকি পায়ে হেটেও স্কুলে আসে আর অতি উচ্চ বিত্তের ছেলেটি ড্রাইভারের হাত ধরে স্কুলের গেট অতিক্রম করে তখন মধ্যবিত্ত ছেলেটি বাবাকে হাত নেড়ে বিদায় জানানোর যে আনন্দটা পায় উচ্চবিত্তের ছেলেটি কিন্তু সেটা হয়ত কখনোই পায় না।

মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে অথবা মেয়ে জানে যে, তাদের অর্থ নেই, প্রতিপত্তি নেই, ক্ষমতা নেই। আছে শুধু সম্মানবোধ; আছে শুধু শিক্ষা; আছে সততা, আছে ভালোবাসার মত কতগুলো গুণাবলী। তাইতো, একটা মধ্যবিত্ত সন্তান কোন কাজ করার আগে হাজারো বার চিন্তা করে যে, সেটি তার পরিবারের সম্মানকে ক্ষুন্ন করবে কিনা? তার কাছের মানুষগুলোকে কষ্ট দেবে কিনা? নিজের পরিবারের কথা ভেবে কখনো কখনো কষ্টকে নীরবে সঙ্গী করে নেয়; নিজের ভালোলাগাগুলোকে দেয় বিসর্জন। জীবন-যুদ্ধের জন্য তাকে নিজেকেই এগিয়ে যেতে হবে এটা জানে বলেই একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান যেকোন কাজের ক্ষেত্রেই নিজেকে উজাড় করে দেয়।

তারুণ্যের অর্থ নিজেকে প্রস্তুত করা, এটা ভাবতে পারে বলেই তারা আনন্দের স্রোতে নিজেকে পুরোপুরি ভাসিয়ে দেয় না।স্বপ্ন দেখা, স্বপ্নে বসবাস করা, নিজের চোখে সেই স্বপ্নের মৃত্যু দেখা, এবং আবার কোনও স্বপ্ন তৈরি করে তার মধ্যে বসবাস শুরু করা – এই হচ্ছে মধ্যবিত্ত জীবন। অনেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন অধিকাংশ মধ্যবিত্ত ছেলেকে নিজের পকেট খরচ চালানোর জন্য করতে হয় পরিশ্রম। কেননা, তাদের কাছে আনন্দ উপভোগের চেয়ে অর্থের মূল্যটা অনেক বেশি। আর সততার অর্থ, ভালোবাসার তাৎপর্য জানে বলেই তাদের কাছে অর্থের চেয়েও আরো বেশি হল অন্তরের মূল্য, মানবতার মূল্য। সমাজে এই মানুষগুলো আছে বলেই হয়ত আজও সমাজটা টিকে আছে, এগিয়ে চলছে।

Advertisements

নিরর্থক


কোথা থেকে শুরু, কোথা গিয়ে শেষ
জানিনা কিছুই আমি, ধারণাও নেই।
এক চিলতে আশা বয়ে বেড়াই শতবর্ষ যেন,
নোনাজলের স্বাদ আসে জিভে, প্রতিদিন।
এক অস্পৃশ্য ধারা, নিত্যদিন, অসম্ভব।

সব দেখে বুঝি, আমি কখনই ছিলাম না
এই জীবনের চালনায়, কী করেছি তার ধারণায়।
স্রেফ সময়ের সাথে সাথে ভেসে গেছি।
ভেসে ভেসে মৃদু সুযোগ নিয়ে হারিয়েছি আরো বেশি।

কালো কালির শব্দগুলো আমাকে কাঁপায়।
আমি কেঁপে কেঁপে উঠি, গমকে গমকে।
সকালের বনবাসের উদ্ভট ঘোষণা জেনে
কী হলো আমার? বুঝলাম, হাল ধরিনি তেমন
তবু তাকে যেন আরেকবার ছেড়ে দেয়া।

সবকিছুই আমার দুঃস্বপ্নের মতন লাগে,
জীবনের প্রতিবেলা, প্রতিটি ঘটনা।
নিরর্থক ধারণ আমার এই প্রাণ।
অর্থপূর্ণ কিছুই করতে পারিনি,
পারিনি কৃষ্ণ-গহবর থেকে বের হতে।

এই লেখা আমার নিরর্থক জানি,
জানি অর্থহীন আমার জীবন ধারণ।
নিরর্থক আমার চাহনি, আমার দীর্ঘশ্বাস।
মুখ বেয়ে আসা শব্দগুলোও নিরর্থক।
জানি চলে যাবো একদিন, সবাই যাবে।
বেঁচে থাকাই কঠিন। খুব কঠিন।

ভারসদৃশ এই প্রাণকে ধারণ করি,
জানি শেষ হবে একদিন, যাবো তার কাছে।
তিনি যদি এমন করে বাঁচিয়ে রাখতেই খুশি হন,
বেশ তো, তবে এভাবেই চলুক সব।

 

বিভ্রম

এই তীব্র স্থিতির মাঝে গতিটাকেই কেমন বেখাপ্পা লাগে।
ভেবে দ্যাখো, আমার শব্দগুলোও কি বেখাপ্পা আর অদ্ভুত?
আমার শত-সহস্র বাক্যগুলো, অনুভূতিদের ছড়িয়ে থাকা কত!
তবু আমার গভীরতম কথা নাকি প্রকাশিত হয় না।

আমার আবেগের গহীনতম শব্দগুলো নাকি অর্থ বয়ে নেয় না।
ছোট্ট এই জীবনের যেখানেই হাত বাড়াই, আমি হেরে যাই।
এই তো কতবার বদলেছি দেখার বাতায়ন, বদলেছি দৃশ্যপট,
অথচ কেন বারবার লজ্জায় নুয়ে পড়তে বাধ্য হই অসহায় হয়ে?

অদৃশ্য পিঞ্জরের এপাশে আমার একলা বসবাস অহর্নিশ।
জানি এই ফেলে যাওয়া দুপুর আর কোনদিন আসবে না।
জানি এই কার্তিকের সন্ধ্যার বিষাদের কবর এখানেই।
জীবন খুবই ক্ষুদ্র, যে যায়, যারা যায়; চিরতরেই যায়।

হাজারবার ভেবেছি জীবনে এই তো শেষ, এই তো!
এই মহাকাব্যের যেন শেষ নেই। প্রতিটি শব্দ বয়ে যায়
তপ্ত অশ্রুধারা আর বক্ষপিঞ্জরের ভেতরে অগ্ন্যুৎপাতের পর।
এ আমার অনুভূতিমালা, আমার নিঃশব্দ বচন, নিশ্চুপ কোলাহল।

বলো তো, বছরের পর বছর ধরে বলা আমার শব্দগুলো
কেমন করে এতটা অর্থহীন বোধ হতে পারে?
কী গভীর যন্ত্রণা সে প্রতিটি শৃঙ্খলাবদ্ধ আবেগের প্রকাশে
তার হিসেব হবে কোন খাতায়? কবে, কোথায়, কেমন করে?

শূণ্য দিয়ে পূর্ণ করি আমার রিক্ততার ডালা।
অঘ্রাণে সেই মেঠো পথের গন্ধে আমার জীবনটা,
পরাবাস্তব জগতের স্বপ্নগুলো, তিক্ত আর কটু স্বাদ;
অনবরত মুচড়ে ওঠা বুক, হেসে ভুলে যাওয়া।

এমনি করে ভুলে যেতে যেতে ক্লান্ত হই, তবু উন্মত্ত হতে পারিনা।
হাসিমুখ পথ চলি, কিছুমিছু জোগাড় করার ন্যুনতম প্রচেষ্টা।
আমি রিক্ত ছিলাম, আছি, থাকবো হয়ত। আমার রিক্ততা
আমাকে করেছে পড়ে থাকা মেরুদন্ডহীন কেঁচোর মতন।

হয়ত একদিন মানুষ হবো, একজন সত্যিকার মানুষ।
ক্ষতবিক্ষত দেহ-প্রাণের আমি নই, সেই শৈশবের আমি।
মেঠোপথে ভেজা শিশিরে পা গলিয়ে ধনেপাতার ক্ষেতে পাশে
নানীর আঙ্গুল ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলা সেই আমার মতন কেউ…

হয়ত কেবলই স্মৃতি, অথবা বিভ্রম?
অথবা আমি নই! সে হয়ত অন্য কেউ…

 

“” নীল “”

তখন সন্ধ্যা নাকি বিকেল মনে নেই। আবছা আলো, স্মৃতির চাইতে বেশি ঘোর সঙ্গী। কোথাও কোন শব্দ হচ্ছিলো একটানা, যান্ত্রিক শব্দ। হুলুস্থূল চিৎকার, বেদনাহত মানুষের আহাজারি, রিকসার ক্রিং-ক্রিং বেলের শব্দ, একটা বাচ্চা ছেলের কন্ঠে মা-সংক্রান্ত খিস্তি, মোবাইলে বেজে যাওয়া অনবরত হিন্দি গান। বৃষ্টির শব্দও আছে, একটানা ঝরে যাওয়া। ঝরে যায় ক্রমাগত। এই পথের কোন ভবনের জানালায় কিশোরি পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছে আনমনে এমনই পথে। দোকানে জ্বলে উঠেছে এনার্জি সেভিং ল্যাম্প

Image

এমন অনেক মূহুর্ত থাকে প্রতিদিনই। মানুষের মনের দৃশ্যগুলো অন্যরকম হয়ত। ঝরে যায় বৃষ্টি, ঝরে যায় অনুভূতি, ঝরে যায় স্মৃতি। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় অনেক তীব্র অনুভূতিরাও জাঁকিয়ে ওঠে, মাটির সোঁদা গন্ধে হয়ত মস্তিষ্কের ভিতরে অনাহূত যন্ত্রণা জেগে ওঠে। চোখের সামনের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে ওঠে, ম্লান হয় বোধ, নিঃশ্বাস গাঢ়…

হেঁটে যাওয়া এই পথ, ঝরে যাওয়া বৃষ্টি। হয়ত পথের শেষ আছে, হয়ত নেই। এই পথ ধরে হেঁটে গেলে ক্লান্তি থাকে হয়ত, হয়ত থাকে না। এই দৃশ্যগুলো হয়ত বিভ্রম, হয়ত না। মানুষে মানুষে আর জনে জনে বোধের জগতে নানান রঙের বিক্ষেপ। অনুভূতিদের হয়ত আলাদা তরঙ্গ আছে, তারা কেবল তাতেই সঞ্চারিত হয়। পাপাচারী আত্মার তরঙ্গ হয়ত প্রশান্ত হৃদয়ের তরঙ্গের চাইতে ভিন্ন। তাদের পথ আলাদা, তারা কেউ কাউকে স্পর্শও করে না। ভিন্ন দ্যোতনায়, ভিন্ন মাত্রায় সঞ্চারণ। বেঁচে থাকার অমোঘ বাস্তব কিছু নিঃসরণ।

বৃষ্টি ঝরে চলেছে গ্রামের মেঠোপথেও। লাল ইট বিছানো, খোয়ার স্তূপের পাশ দিয়ে ট্রাক চলা পথের ভেঙ্গে যাওয়া এই রাস্তা এঁকেবেঁকে যায় বিশাল ভিটে পার করে। রাস্তার পাশেই বড় বটগাছ, আজকাল দেখা যায় না। আগামীতে হয়ত থাকবে না। অনুভূতিরাও কি এভাবে হারায়? আবার, শতবর্ষী এইরকম বটের ছায়ায় হয়ত অনেক মানুষ নিয়েছে ছায়া, অনেক কিশোরের হাতের লাঠি আঘাত করেছে বৃদ্ধ বটের গায়ে। সে তবু আগের মতন আছে, অপরিবর্তিত। বয়স হয়েছে, ঠায় দাঁড়িয়ে সে দেখে গেছে মানুষের কাজ। কত মানুষও এমন বটের মত, দীর্ঘকাল দেখে চলে। চারপাশ বদলায়, তার মাঝেও পরিবর্তন আসে। শাখা-প্রশাখা মেলে ধরে বড় হয়। আয়ুষ্কাল কমতে থাকে বলে একসময় শক্তিও কমে যায়। বার্ধক্য গ্রাস করে ধরে।

কত কিছুই বদলে যায়। একই রকম সন্ধ্যা-রাতের আগমন ঘটেছে সৃষ্টির শুরু থেকেই। আলাদা কীসে প্রতিটি দিন, কোন মানুষের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়? কেমন করে সুখী হয় কেউ, দুখী হয়। বটের ধরে থাকা, আঁকড়ে রাখা মাটিতেই মিশে যায় গোটা গ্রামের একের পর এক মানুষ। জন্মে যাওয়া, দৌড়ে চলা, উদ্ধত যৌবন, ম্রীয়মান বার্ধ্যকের পরে মিশে যায় মাটিতে। এক অবিন্যস্ত আত্মার উড়ে চলা ইতস্তত তীব্র ধাক্কায় বয়ে চলা অশ্রুধারা, নীলাভ বেদনা, নীল নীল যন্ত্রণার নখর, প্রচেষ্টা আর ঘটনার অনির্বন্ধ পরিণতি। কিছু হয়, কিছু করে কেউ, কিছু অনড়, কিছু হয়ত অভিশপ্ত, কিছু হয়ত সুযোগ, কিছু বিরতিহীন যন্ত্রনার তুচ্ছার্থক ফল। সবই সময়ের, ফলাফল ভিন্ন। কোন মাপনযন্ত্রে মাপে কে? 

নীলাভ্র পাহাড়ের চূড়া, শীতল সুউচ্চ পর্বতারোহণ, সুতীব্র ঝড়ো বাতাস, ছাইচাপা আর্তনাদ, পুড়ে যাওয়া তাঁবুর ধোঁয়া, অদৃশ্য অশরীরি আত্মার মরীচীকার মতন বয়ে চলা, নীল অনুভূতি, নীল আসক্তি, নীল অবগাহন, নীল পারমিতা, নীল অভিশাপ, নীলের বন্ধন, নীল চিৎকার, অবনীল, সুনীল, নীলিমার নীতিহীন অনুভূতির নখরাভিজান। অন্য কোন নীলের প্রবাহ জাগায় কি কোথাও অন্য কোন অন্তরে, নতুন কোন নীলাম্বরীর প্রাণে নীল বিষাক্ততা? কে জানে এই বেদনানীল কাব্যের কোন শেষ পংক্তি আছে কিনা, নাকি হঠাৎ এই শত-সহস্র শব্দ নিরর্থক আঁচড় হয়ে রবে, হয়ত কবির স্থান হবে অবাঞ্ছিত কাতারে, অচ্ছুৎ যন্ত্রণা!!

 

এক নিস্তব্ধ ভালবাসা

পিটপিট করে চোখ মেলে নিজেকে খুঁজে পায় রুদ্র হাসপাতালের ICU তে। বিরক্তি ভরা চোখে চারদিক দেখতে থাকে। তার তো এখানে থাকার কথা না। তাহলে কি কোথাও গড়মিল হল!!! লজ্জায় মুষড়ে পড়ে রুদ্র। এত ছোট কাজটাও সে ঠিকমত করতে পারলনা। তার মা সময়মতই তাকে ধরে এখানে এনেছেন। এক নিদারুণ লজ্জা আর ঘৃণা অনুভব করলো নিজের প্রতি। কাল বাদে পরশু ঈদ। তবে কিনা এই ঈদ মানুষটিকে ছাড়াই পালন করতে হবে?

 … … … …

 অনবরত মুঠোফোনটা বেজেই চলেছে, দৃষ্টি আকর্ষণের বৃথা প্রচেষ্টা। একজন দুজন নয়। বহু মানুষ স্মরণ করছে ওকে। শুভেচ্ছা বার্তা ও পেয়েছে, নিছক কম নয় তার পরিমাণ ও। আজ ঈদ এর দিন। কোন ভ্রূক্ষেপ ই নেই ওর। সকালে ঈদ এর নামাযটায় ও অনুপস্থিতি। গায়ে দেয়া হয়নি প্রিয় মানুষটির দেয়া নীল পাঞ্জাবীটি। ঘুমহীন টলটলে দুটো চোখ, অনিয়মে বেড়ে ওঠা মাথা ভরা উস্কখুস্ক অগোছালো চুল আর নিথর দেহটা দেয়ালে ঠেকিয়ে দৃষ্টি মেলে আছে জানালা গলে বাহিরে। রোদেলা আকাশে মেঘ জমেছে, মেঘের আড়াল দিয়ে সূর্যের উজ্জ্বলতা ছড়ানোর তীব্র প্রচেষ্টা দেখতে খারাপ লাগছেনা আজ।

 

এক দুবার হয়তো চোখের পাতা ফেলেছিল, এর ই মাঝে এক পসলা বৃষ্টি যে কখন ঝরে পড়ল সেই সময়টি ও দেখা হয়নি আজ। মেঘরাজ বিদায় নিয়েছে, সূর্যের আলোতে জলে ভেজা নারিকেলের পাতাগুলোতে কে যেন মুক্ত গেঁথে রেখেছে। হঠাৎ করেই কোত্থেকে জানি এক বৃষ্টিভেজা শালিক এসে বসলো পাতার উপর আর শুরু করলো জল ঝারবার কসরত। এক শালিক দেখে আজ ও একটু ও বিচলিত নয়। কিভাবে হবে! একা একা তো ঝগড়া হয়না।

 

সম্বিত ফিরে পেল রুদ্র ছোট ভাইটার করা অনাকাঙ্ক্ষিত এক প্রশ্নে। ও যে কখন ঘরে ঢুকেছে খেয়াল ই করেনি। “ভাইয়া, তুমি কি গোঁফ দাঁড়ি করছ?” সহজ সরল প্রশ্নটা শুনে এক গাল হাসল রুদ্র। পাশের কক্ষ থেকে মা শুধরে দিল, “গাধা। গোঁফ দাঁড়ি করতে হয়না, রাখতে হয়।” হয়তো নিজের অজ্ঞতার লজ্জায় ছোট মানুষটা আর দাড়ালোনা ঘরে, অন্য ঘরে চলে গেল।

 

রুদ্রর হাতে আজ অনেক সময়। আজকের দিনটার কোন প্রভাব নেই ওর মনে। নেই কোন পরিকল্পনা। জীবনের নিদারুণ বিড়ম্বনায় আজ অনেক বেশি আহত সে। দেয়ালে ঝুলানো যান্ত্রিক পাখাটার দিকে তাকিয়ে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেয় কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা করা হয় পাখাটা কোনদিকে ঘুরছে, হয়তো বলবে, “কই! খেয়াল করিনি তো!” আজ রুদ্র বড্ড এলোমেলো। ওর জীবন বধ করা হয়েছে, মনের মানুষটা তার কাছে শুনতে চায়না আর ভালবাসার গল্প।

 

ঈদ এর বিকেল। সবাই বেরিয়েছে ঘুরতে। হ্যাঁ। সবাই। শূন্য দৃষ্টি মেলে সামনে চেয়ে আছে রুদ্র। সূর্যের হলদেটে আভা চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। আবার শুরু হল বৃষ্টি, ক্ষণিকের জন্য। রুদ্রর মনে পরে গেল সেই দিনটির কথা, যেদিন এই বর্ষার প্রথম কদম ফুলটি তার হাতে তুলে দেয়ার ভূত ঘাড়ে চেপেছিল।

নাহ… কোন ফুলের দোকান ঘুরে ফুল পাওয়া যায়নি। রাজপথে ফুল হাতে ছুটে আসা ক্ষুদ্র বিক্রেতাও ফুল এর সন্ধান দিতে পারেনি। সারা সকাল দুপুর বহু এলাকা ঘুরেছে, কদম ফুলগাছও পেয়েছে কিন্তু একটা ফোঁটা ফুলও যে পাইনি। গোল গোল সবুজ ফুলগুলো যেন ওর দিকে চেয়ে রসিকতা করেই দুলছিল। অবশেষে পথ চলতে চলতেই দেখল এক পথশিশু কদমফুল ছিড়ে ছিড়ে পথে ফেলছে। হুড়মুড় করে রিকশা থেকে নেমে ছুটে গেলো ছেলেটার কাছে। বাচ্চাটার হাতে দেখল মাত্র একটা আধা ছেড়া ফুল। জিজ্ঞাসা করলো ফুলগাছ কোথায়। প্রত্তুতরে ছেলেটা জানাল, “ভাই। ফুল তো জালায় নাই।” মানে, ফুল তো ফোটে নাই। আশা হারালোনা। ছেলেটাকে সাথে নিয়েই খুঁজে বের করলো কদম ফুলগাছ। প্রস্ফুটিত কিছু ফুল দেখে খুব খুশি হল রুদ্র।

এরপর শুরু হল আরেক পরীক্ষা। গাছে উঠতে পারেনা রুদ্র। আশেপাশে তেমন কাউ কে পেলনা। কিন্তু ফুল তো যেভাবেই হোক লাগবেই। বহু কসরত করে কিছুদূর উঠল। এরপর একটা লাঠি আর ওর মাঝারিকার দেহটা কাজে লাগিয়ে বহু ভঙ্গিমায় কিছু ফুল পাড়ল। ফুলগুলো একত্র করে শুরু করলো আবার পথচলা। সারাটা দিন খাঁ খাঁ রোদ ছিল। তৃষ্ণা পেয়েছে টের পেল। দু বোতল পানি কিনল। একটা নিজে পান করলো আরেকটা থেকে মাঝে মাঝেই ঠাণ্ডা পানি ঢালল ফুলের ওপর। পাছে ভয় হয়, এই গরমে ফুলগুলো যদি মিইয়ে যায়। একটা বার ও হাত থেকে কোথাও রাখলনা কারণ চোট পেলে ফুলের পাপড়ি গুলো বসে যেতে পারে।

এভাবেই পৌঁছল গন্তব্যে। তখন সন্ধ্যা। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেনা কিভাবে দিবে ফুলগুলো ওর হাতে। ততক্ষণে ফুলগুলো মিইয়ে গেছে। আর দেরি না করে মন মানুষটিকে ডাক দিয়ে হাতে ধরিয়ে দিল ফুলগুলো। কিভাবে দিতে হয় রুদ্র জানতোনা। অপরিণত মস্তিষ্কের পাগলামির এই অঘোষিত প্রচেষ্টা পরিণতি পেল। মনের মানুষটার মুখে এক ঝলক হাসির দেখা সে পেল। মানুষটি বলল, “আমার জন্য কেউ কখনো এমন করেনি।” রুদ্রর মনে হল, এতটুকুই তো সব, আর কিছু চাইনা জীবনে। সারাদিনের অভিযানের পর এক সুখী মানুষের তৃপ্ত হৃদয় নিয়ে রুদ্র ঘরে ফিরল।

 

রুদ্র আজ নিশ্চুপ। দুনিয়ার গড়া তথাকথিত সমীকরণে ওকে ফেলা হয়েছে আজ। আর দশটা হীনচেতা মানুষের সারিতে ওকে দাড় করানো হয়েছে আজ। অপরাধ টা কি? রুদ্র জানেনা। হয়তো ওর পাগলের মত অস্বাভাবিক ভালবাসা আজ মানুষের কাছে দৃষ্টিকটু। হয়তো ওকে আজ বিশ্বাস করতে পারেনা মানুষটি। রুদ্র জানেনা কিভাবে প্রমাণ দিবে। এইতো গতদিন ও রুদ্র নিকষ আঁধার দেখে ফিরেছে, একটুও দ্বিধা করেনি এইভেবে যে মানুষটা হয়তো সুখে থাকবে ও সরে গেলে। এর থেকে বেশি কিছু রুদ্রর জানা ছিলোনা।

দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। দূরের দৃশ্যপট গুলো আর দেখা যাচ্ছেনা। রুদ্র বুঝল সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এর ই মাঝে মা কয়েকবার এসে খেতে বলে গেছে। লাভ হয়নি। জোর করে কিছু খাইয়ে দিয়েছে, রুদ্র টের পায়নি। এখন মুখটা মিষ্টি লাগছে, হয়তো পায়েস ছিল জিনিসটা।

এখন রাত। ঈদ এর দিনটি প্রায় শেষ। গানের গলা ভালোনা রুদ্রর। মনের মানুষটিকে তাই গান শোনাতে পারেনা সে। কিন্তু এখন সে গাইছে, ভয় কি! কেউ তো আর শুনবেনা। গলা ছেড়ে গান গাইছে রুদ্র। চোখের জল গাল গড়িয়ে পরছে। কাঁপা কাঁপা ভাঙ্গা গলায় তারপরেও সে গাইছে।

বহু নামে ডাকতো রুদ্র তার মনের মানুষটিকে। বহু নামে। সব গুনলে হয়তো কয়েক ডজন হবে। আজ ডাকতে পারেনা। ওর উপর আজ মনঃমানুষটির নিষেধাজ্ঞা আরোপিত। রুদ্রর খুব কষ্ট হয়। নীল বেদনায় ছটফট করে বিছানায়। আজ ওকে দেখবার কেউ নেই। রুদ্র আজ অনেক একা। ওর চারপাশের জীবনগুলো আপন গতিতেই চলছে, ওকে নিয়ে কোন পরিকল্পনা হবেনা, ওর জন্য কেউ সাজবেনা, সামনে দাড়িয়ে বলবেনা, “দেখো তো আমায় কেমন লাগছে!”, এভাবেই চলতে থাকবে সবকটি মানুষের পৃথিবী। থেমে থাকবে রুদ্রর মতো কিছু মানুষের জীবন। হয়তো সে একটু আলাদা, হয়তো মানুষ না। আজ ও নিজেকে বড্ড ভয় পায়, যেমন টা আগে ছিলোনা।

 

 ঈদ এর দিনরাত উভয়ই পরিসমাপ্তির পথে। রুদ্র এখনো ভালবাসে তার মনের মানুষটিকে, হয়তো আগের থেকে আরও বেশি। কিন্তু আজ ও বলতে পারেনা, নাম ধরে ডাকতে পারেনা, আগের মত করে হাসতে পারেনা। একটা আশা নিয়ে এখনো বেঁচে আছে সে। হয়তো ওর মানুষটি একদিন বুঝবে ওকে, তারপর ওকে শেখাবে কিভাবে হাসতে হয়, কিভাবে ভালবাসতে হয়।

 রাত খুব বেশি না। তাতে কি! রুদ্র এখন ঘুমাবে…..

 

প্রেম, বিয়ে, অতঃপর …

“আগে জানলে, তোমাকে বিয়েই করতাম না।“

“কি জানলে?”

“এই মেজাজ আর এই চেহারা ওয়ালা মেয়েকে পাগল ছাড়া আর কেও বিয়ে করে?”

“তা হলে প্রেমে পড়ে মজনু হয়েছিলে কেন? আবার যে দুই বার স্যুইসাইট করতে নিয়েছিলেন জনাব। সেই কথা নতুন করে মনে করে করিয়ে দিতে হবে না-কি?”

“সেই মেয়ে তো আর এখনকার তুমি না?”

“দেখ বেশী মাথা গরম করিয়ে দিও না। তুমি যেই অহনার প্রেমে পড়ে দিওয়ানা হয়েছিলে, সে ছিল আমার বাবার আদরের দুলালী। অনেক আদর-যত্নে বড় করেছিল। আর সেই আদরের দুলালীকে দিনে দিনে ধবংস করে তুমি আজকের অহনাকে বানিয়েছ”।

“কি বললে, আমি তোমাকে ধবংস করেছি। ঠিক আছে যাও বাবার বাড়ি যেয়ে আলালের ঘরে দুলালী হয়ে থাক যেয়ে।“

“কি, কি বললে? আমাকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলছ?”

“তা বলবো কেন?  তুমিই তো বললে আমি তোমাকে ধবংস করে দিয়েছি।”

“ঠিক আছে, আমি আজকেই চলে যাব।”

ব্যাস আরম্ভ হয়ে গেল, পারিবারিক তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আরেক পর্ব। একেবারে সম্মুখ যুদ্ধ।

প্রতিপক্ষ দুই নিয়মিত পরাশক্তি অহনা আর কাজল।

 

দুই পক্ষের শান্তিকালীন সময় বেশী দিন স্থায়ী হল না। এর আগের বড় যুদ্ধের পরে অহনা চলে গিয়েছিল বাবার বাসায়। যাবার সময় বলে গিয়েছিল, চল্লিশ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় বিবাহ করে দেখিয়ে দিবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে আকাশের মেঘ তাদের বাঁচিয়ে দিল। অহনা অন লাইন ম্যাচিং সার্ভিসকে বললো, তার এমন ছেলের দরকার, যে ছেলে মেঘের সাথে কথা বলতে পারে। শেষে দেখা গেল, কাজলই এক মাত্র সে রকম ছেলে, যে মেঘের কথা বুঝে। তার পরে দু জনের মিলমিশ হয়ে গেল।

তিন মাসের মধ্যেই প্রথম সংঘর্ষ লাগলো। অহনা এখন কম্পিউটারে বেশী সময় কাটায়। ফেসবুক, ই-মেল, ফার্ম ভিল আর কত কি। কাজল প্রথমে অবাক হল। যে মেয়ে মাত্র কয়েক দিন আগে পর্যন্ত কম্পিউটারের আশে পাশে পর্যন্ত যেত না, সে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছে সেখানে। আড়িপেতে দেখল, বিষয়টা কি? যে রকম সন্দেহ, অনেকটা সে রকম আবিষ্কার করলো। এখনো অহনাকে অন লাইন ম্যাচিং সার্ভিস থেকে ঠিকানা পাওয়া ছেলেরা ইমেল করছে। অহনা ওদের উত্তর দিচ্ছে। কেও কেও আবার ফেসবুকের বন্ধু পর্যন্ত হয়েছে। ব্যাপারটা ভাবতেই কাজলের শরীরটা রি রি করে উঠলো।  কে জানি বলেছিল, মেয়েদের ভালবাসা নদীর মত। তা শুধু বহেই যায়।  অহনার ভালবাসা কি কাজলকে ছাড়িয়ে চলে গেছে অনেক দূর! এ গুলো ভাবতেই কাজলের মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। কিছু একটা প্রচণ্ড শব্দ করে ভেঙ্গে ফেলতে পারলে খুব ভাল হত।

অহনা দেখল, বাড়ি ফিরে আসার পরে, প্রথম কয়েক দিন কাজল তাকে খুব মনযোগ দিল। সাথে সাথে থাকা, বেড়াতে যাওয়া,  গল্প করা, সুযোগ পেলেই হাত ধরে বসে থাকা আর কত কি। কয়েক বার ছাদে যেয়ে মেঘের সাথে কথা পর্যন্ত তারা বলেছে। ঠিক সে-ই প্রেম করার দিনগুলোর মত। কিন্তু কাজল আবার আগের চেহারা পেতে থাকলো। ছুটির দিনে দেরী করে ঘুম উঠা, খাবার টেবিলে বসে মোবাইলে বন্ধুদের সাথে কথা বলা। অহনার সব কথা ভুলে যাওয়া রোগটা কাজলের ফিরে আসলো। মামাকে জাপানে চিঠিটা পোস্ট করেছ, গ্যাসের বিল দিয়েছ, কলের পানি বন্ধ হচ্ছে না, সারা দিন টিপ টিপ করে পড়ছে, মিস্ত্রিকে ডেকেছ?——– এ রকম সব প্রশ্নের উত্তর কাজল কি দিবে, অহনার একেবারে তা জানা। ‘মনে ছিল না, ভুলে গেছি’। অহনা  গজ গজ করতে থাকে, সব কাজই যখন ভুলে যাও, তখন বিয়ে করার কথাটা মনে রেখেছিলে কি করে।  এ রকম লোকের সাথে আর যাই হোক ঘর করাটা মুশকিল।

 

দুই পক্ষের কথা বার্তা বিভিন্ন মেয়াদের জন্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অসহযোগ আন্দোলন হচ্ছে। এর মধ্যে কয়েকবার অনশন ধর্মঘট পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু কোন আন্দোলনের ফলাফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। যখনই এক পক্ষের মনে হচ্ছে বেশী ছাড় দেয়া হয়ে গেছে, তখনই আবার নতুন করে আক্রমন করা হচ্ছে। দুই পক্ষই কোন নতুন সুযোগ হাত ছাড়া করতে রাজী না।

এ রকম কঠিন অবস্থার মধ্যে প্রকৃতির আরও কিছু রসিকতা করার ইচ্ছে হল। ঘুমের মধ্যে এ পাশ ওপাশ করতে কাজল সশব্দে নাক ডাকার অভিষেক করলো। অহনা ধাক্কা দিয়ে কাজলকে এপাশ থেকে ওপাশ করলে, মিনিট পাঁচেকের জন্যে নাক ডাকা বন্ধ থাকলো। তার পরে আবার নতুন উদ্যমে আরম্ভ হল।  বেচারা অহনার ঘুম হারাম হয়ে গেল। মানুষ আবার এত জোরে নাক ডাকে ন-কি!

অহনা প্রথমে কয়েক দিন সহ্য করার চেষ্টা করলো। ভাবল তুলির মত অভ্যাস হয়ে যাবে। তুলি একবার গল্প করেছিল, তার স্বামীও একবার হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা আরম্ভ করলো। কয়েক দিন সমস্যা হলেও, তুলির এখন নাক ডাকার শব্দ শুনতে ভালই লাগে। কেমন একটা ঘুম পাড়ানির গানের মত মনে হয়। কিন্তু অহনার বেলায় হল ঠিক উল্টো। রাতের বেশীর ভাগ সময় না ঘুমিয়ে কাটাতে হলো।

অনেকটা বাধ্য হয়ে, অহনা বেশ মিষ্টি করে বলল, তুমি কি একটু ডাক্তার চাচার সাথে দেখা করতে পার? কথাটা শুনে কাজল ভাবল, নিশ্চয়ই অহনার কোন সমস্যা হয়েছে। দুর্বল প্রতিপক্ষের সাথে তো আর যুদ্ধ করা চলে না। মনে মনেই ‘সিস ফায়ার’ ঘোষণা করলো। এখন থেকে যুদ্ধ বিরতি কিংবা যুদ্ধ একেবারে বন্ধ। জানতে চাইলো, কেন, কেন ডাক্তার চাচাকে কি বলতে হবে?

অহনা খুব নরম করে বলল, যেয়ে বল, তুমি ঘুমালে ভীষণ নাক ডাকছ, আমি ঘুমাতে পারছি না। এর জন্যে তোমাকে ওষুধ দিতে। কাজল ধরে নিল, তাকে ছোট করার জন্যে এইটা অহনার অবশ্যই নতুন একটা কৌশল। বেশ জোরেই উত্তর দিল, আমি নাক ডাকি আর আমি জানি না। আর উনি শুনতে পান। কাজল ‘সিস ফায়ার’ উঠিয়ে নিয়ে একটা নোংরা ধরনের অস্ত্র ব্যাবহার করলো, স্বপ্ন দেখার মাত্রা কিছুটা কমালে সব ঠিক হয়ে যাবে। কাল্পনিক নাক ডাকার শব্দে আর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে না।

বিজ্ঞানের সুফল আর কুফল নিয়ে যদি কখন বিতর্ক হয়, তবে পরের দিনের ঘটনা তার একটা বিশাল বড় উদাহরন হতে পারে। ওই দিন রাতেই, অহনা মোবাইল ফোনের ভিডিও অপশনে যেয়ে, কাজলের নাক ডাকা রেকর্ড করলো। সকালে কাজলকে ভিডিও দেখাল। কাজল দেখে কিছু বলল না, কিছু একটা একটা চিন্তা করতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বুঝল, অহনার কাছে ঘায়েল হয়েছে। বক্সিং খেলায় চিৎপটাং হয়ে নক আউট হয়ে যাবার দশা।

রাতে কাজল বালিশ, কাঁথা নিয়ে বসার ঘরে সোফায় যেয়ে ঘুমাল।

 

অহনা প্রথমে এক হাত নিতে পারাতে খুশীই হল। যাক বাবা, অনেক দিন পরে একটু আরাম করে ঘুমান যাবে। আর যাই হোক, এত শব্দের তার ঘুমান সম্ভব না। এই সব ভাবতে ভাবতে আসলেও অহনা ঘুমিয়ে পড়ল। আহ কি আরাম। পৃথিবীতে ঘুমের থেকে প্রশান্তির জিনিষ কি আর কিছু আছে?

স্বপ্নের মধ্যে মনে হতে থাকলো, সে নাক চুলকানোর কিছু একটা দেখছে।  একটু পরে মনে হতে থাকলো, নাকটা মনে হয় বাস্তবেই চুলকাচ্ছে।  চোখ খুলে বুঝার চেষ্টার করতে লাগলো, স্বপ্নের নাক চুলকানি কেন বাস্তব মনে হচ্ছে।  কিন্তু, সেই সুযোগটা বেশীক্ষণের জন্যে পেল না। আরম্ভ হল, হাচ্চু, হাচ্ছু, হাচ্ছু। এক, দুই, তিন,…………একুশ, বাইশ……তেত্রিশ। শুধু নাক না, গলা, চোখ সব চুলকাচ্ছে। বুঝল এলারজি এ্যাটাক। বিয়ের পরে এই প্রথম। পৃথিবীর কোন ওষুধ এখন কাজ করবে না।

কাজল পাশের ঘর থেকে ছুটে আসলো। ভয় পেয়ে গেল। যুদ্ধের সব কথা ভুলে যেয়ে মানবতা এসে মনে ঠায় নিল। চল, চল, তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। অহনা হাচ্চুর ফাঁকে ফাঁকে বললে, একটু… পরে… কমে… আসবে………।

পরের দিন নাস্তার টেবিলে, অহনা কাজলকে তার এলারজি এ্যাটাকের কথা বলল। এই সমস্যা না বলে কয়েই আসে। বেশ কয়েক বছর আসে নি।  কিন্তু আসলে কিছুক্ষণ খুব যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। কাজল ভাবল, কালকের ঘটনার প্রতিশোধ এত অল্প সময়ের ব্যাবধানে আসলো। ভাগ্যটা সুপ্রসন্ন মনে হল। বুকের ছাতিটা ফুলিয়ে বলল, আমার নাক ডাকার শব্দে একটা মানুষের ঘুমের সমস্যা হয়েছিল। আর তোমার হাচ্ছুর শব্দে পুরো পাড়ার মানুষ ঘুম থেকে উঠে বসেছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে প্রথম বলে ওপেনিং ব্যাটসম্যানকে বোল্ড আউট করার মহা প্রসাদ পেল। আহ, কি আনন্দ! প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করা গেল।

 

কাজল বসার ঘরে অপেক্ষা করছে। এই বুঝি অহনা বের হয়ে গেল। মাথার মধ্যে কত চিন্তা কাজ করছে। এক সময়কার লাস্যময়ি অহনা  আর তার সাথে হাসি মুখে কথা বলে না। তার সব কিছুতেই মহা বিরক্তি। এখন দু জন দুই ঘরে শোয়। এটা কি কোন দাম্পত্য জীবন হল। একটু নরম শরীরের ছোঁয়া নে পেলে কি আর ঘুমান যায়। কিন্তু অহনা যখন ওই সবের কোন মর্যাদা দিতে পারে না, তখন আবার কিসের কি?

ঘণ্টা খানেক বসে, উঁকি দিয়ে বুঝার চেষ্টা করলো অহনার এত সময় লাগছে কেন।  অবাক কাণ্ড। অহনার কানের মধ্যে হেড ফোন দিয়ে একটা গল্পের বই পড়ছে। কি অদ্ভুত, ওর না চলে যাবার কথা। দেখা যাক আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে।

পরের বার যেয়ে দেখা একই অবস্থা। অহনা একেবারে বইয়ের মধ্যে ঢুকে আছে। মাঝে মাঝে আবার মুচকি মুচকি হাসছে। হয়তো হাসির কোন গল্প। কাজল যেয়ে অহনার পিঠে টোকা মেরে, হাতের ইশারায় বলল, কি ব্যাপার, তোমার যাবার কি হল?

অহনা একেবারে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, কানের হেড ফোন খুলে, বইটা পাশে রেখে কাজলের দিকে তাকাল। সেই, সেই দৃষ্টি। আগে যখন ওরা প্রেম করত, তখন কোন কারণে যদি এক দিন যদি দু জনের দেখা না হত, সেই দৃষ্টি।  অহনা সেই অপলক দৃষ্টি দিয়ে কত হাজার কথা না বলত। কোথায় ছিলে, কেমন ছিলে, তোমাকে না দেখে চোখটা শুকিয়ে পাথর আর বুকটা মরুভুমি হয়ে গেছে। একেবার কাজলের বুক ছিদ্র হয়ে গলে পড়তে লাগলো। এখন বললে, কাজল, অহনার জন্যে সুন্দরবন থেকে নিজের হাতে একটা মায়াবী চোখের হরিন নিয়ে আসতে পারে। আরেক কথায় এভারেস্টের চূড়ায় যেয়ে এক মুঠো বরফ নিয়ে আসতে পারে। এই মেয়েকে ছেড়ে এক মুহূর্ত থাকা সম্ভব না।

কাজলের অবাক হওয়ার আরও বাকি ছিল। অহনা কাজলের কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিস ফিস করে বলল, তোমার পাশের সোফায় গত তিন রাত একটা মেয়ে যেয়ে ঘুমায়, তা কি তুমি জান। আসলে অহনা, গত কয় রাত কাজল ঘুমিয়ে যাবার পরে তার পাশের সোফায় যেয়ে শোয়, আবার সকালে কাজলের উঠার আগে চলে আসে। অহনা বলতে লাগলো, তোমার নাক ডাকার শব্দ, এখন আমার তুলির মত, ঘুম পাড়ানির গান মনে হয়।

কাজলের সাথে সাথেই অহনার সব কিছু মিষ্টি মনে হতে লাগলো। এ যে চিনির থেকে বেশী মিষ্টি, গুড়ের থেকে বেশী মিষ্টি, মধুর থেকে বেশী মিষ্টি। এই মিষ্টিতে কোন ক্লান্তি নাই। এ যে একেবারের অন্য রকম মিষ্টি।  যে এ মিষ্টির সাধ এক বার পেয়েছে, সে-ই শুধু জানে এ কি রকম মিষ্টি।

পারিবারিক তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ অনির্দিষ্ট কালের জন্যে মুলতবী হয়ে গেল।

 

ওরা দুইজন একই সাথে রিকশাটা ডেকেছিল

ঘড়িতে এগারটা বাজে। অনিক কলাপসিবল গেইট ঠেলে সিঁড়ি ভেঙ্গে মাত্র বাসায় ঢুকল। নিচতলার ভাড়াটিয়ারা ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনিকের অবাক লাগে-আজকাল কেউ বারোটার আগে ঘুমায়না,এরা এত তাড়াতাড়ি ঘুমায় কী মনে করে? অনিক আবারো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে কলিং বেল চাপল। দুই বছর আগে যখন সে কলেজে ছিল তখনো এত রাত করে বাড়ি ফেরার কথা সে ভাবতে পারতনা। ভার্সিটিতে উঠার পর থেকেই বাল্যকালে প্রণিত হওয়া বজ্র-কঠোর সামরিক নিয়মগুলো আস্তে আস্তে শিথিল হতে শুরু করেছে। অনিকের ক্লাস টেনের পিকনিকের আগের রাতের কথা মনে পড়ে যায়। সেদিন রাত করে বাড়ি ফিরেছিল বলে পরদিন বাবা তাকে পিকনিকেই যেতে দেয়নি। আর আজকাল তার বাড়ি ফিরতে প্রায়ই দশটা এগারটা হয়,অথচ বাবা কোনদিন একটা কথাও শুনায় না। হয়তো অনেকদিন পর পর ঢাকা থেকে ছুটি কাটাতে আসে বলেই বাবা-মার এরকম নিদারুণ উদাসীনতা। মা অবশ্যি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে-এতক্ষণ কোথায় ছিলি?

অনিক প্রতিবার একই উত্তর দেয়- সী বীচে ছিলাম।

আসলে প্রতিদিন সে সমুদ্রের পাশেই বসে থাকে। কখনো একা,কখনো সাথে থাকে আসিফ কিংবা আতিক। অনিকের স্কুলের বন্ধুরা বেশিরভাগই ঢাকা কিংবা চিটাং এর প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে পড়াশুনা করে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াই তার ভ্যাকেশনের ব্যাপ্তি এবং ফ্রিকোয়েন্সি অন্যদের চাইতে বেশি। তাই যে সময়টাতে সে বাড়িতে ছুটি কাটাতে আসে,তার বন্ধু-বান্ধবের অধিকাংশই ঐ সময় বাইরে থাকে। এবারের ছুটিটাও বলতে গেলে অসময়েরই ছুটি। ঘনিষ্ট বন্ধুরা বেশিরভাগই শহরের বাইরে।

তারপরও অনিকের সময়গুলো খারাপ কাটছেনা। সকালে দেরী করে ঘুম থেকে উঠা, হোস্টেলের একঘেয়ে স্বল্প মশলাযুক্ত খাবারের বদলে মায়ের হাতের অমৃত খাওয়া,ইচ্ছেমতো গল্প-উপন্যাস পড়া,ল্যাপটপে ম্যারাথন সিরিয়াল দেখা;আর আসিফ-আতিক-যে দুই একজন বাল্য বন্ধু মফস্বলের সরকারী কলেজেটাতে পড়ছে তাদের সাথে বাইকে করে এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ানো,আড্ডা দেওয়া,সাগর পাড়ে বসে থাকা। এভাবে ভালই কেটে যাচ্ছে তার টার্ম ফাইনাল ভ্যাকেশন।

 

আজও বাবা-মা কেউ জানতে চাইলো না এত দেরী হল কেন। অনিক নিজ থেকেই কৈফিয়ত দেয়ার চেষ্টা করল-‘বুঝলে আম্মু,কক্সবাজার শহরটা পুরা হেল হয়ে গেছে। এতক্ষণ রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেই নয়টা থেকে। কেউ আসতে রাজী হয় না। সবাই শুধু ট্যুরিস্ট খুঁজে। লোকাল হয়ে আমরা যেন বিরাট অপরাধ করে ফেলেছি।’

 

‘হয়েছে,আর বাহানা দিতে হবেনা। খেতে আয়। তোর জন্য সবাই না খেয়ে বসে আছি।’

 

অনিক মনে মনে লজ্জ্বিত হয়। আসিফের পাল্লায় পড়ে তার আজ এত দেরী হয়ে গেল। আসিফের বাইকে করে সে গিয়েছিল ইনানীর দিকে। আসিফ কয়দিন ধরেই বলছিল জোছনা রাতে পাহাড় আর সমুদ্র নাকি একসাথে দেখতে অসাধারণ লাগে। আজ ভরা পূর্ণিমা। সন্ধ্যার দিকে চাঁদের এই গর্ভাবস্থা দেখে ওরা দুইজন বেরিয়ে পড়ে। সমুদ্র আর পাহাড় দেখতে দেখতে কখন যে দেরী হয়ে গেল খেয়াল ছিলোনা। আসিফ অবশ্য একটুও বাড়িয়ে বলেনি। দৃশ্যটা প্রকৃত অর্থেই দেখার মত। পাহাড়ের নিস্তব্ধতার বিপরীতে সমুদ্রের গাম্ভীর্‍য মেশানো চঞ্চলতা। সাথে অবারিত জোছনার প্লাবন। শুধু দর্শনীয় না,অনুভব করার মত ব্যাপারও বটে।

 

অনিক খাওয়া দাওয়ার পর তার ছোট ভাইটাকে কিছুক্ষণ পড়া দেখিয়ে দিল। তার একটাই ভাই,বোন নেই। অনুজের সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা। প্রতিদিন রাতে কিছুটা সময় ভায়ের পাঠোন্নতিতে ব্যয় করে সে। এক ঘন্টা স্বেচ্ছা শ্রমের পর মাথাভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সেই সংলগ্ন দারুণ অনুভূতি নিয়ে নিয়ে অনিক চমৎকার একটা ঘুম দিল। এক ঘুমেই রাতের সাথে সকালের বিনিময়।

 

২.

 

সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা দেখে অনিকের ফুরফুরে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। তাদের ভার্সিটি খুলতে নাকি আরো দেরী হবে। কী এক ধর্মঘট শুরু হয়েছে শিক্ষকদের। এতদিন কী করবে এখানে সে? বিরক্তিকর।

 

‘শোন অনিক,নাস্তা করে একবার তোর খালার বাসা থেকে ঘুরে আয়। এই সপ্তাহে একবারো ওদিকে যাসনি। তোর খালা যেতে বলেছে। খালা মায়ের মত। এভাবে ভুলে যেতে হয়না। যোগাযোগ রাখতে হয়।’

মায়ের সামাজিকতা রক্ষার চিরাচরিত উপদেশ শুনে অনিকের বিরক্তি আরো বাড়ে। খালার বাসায় যেয়ে কী করবে সে? খালার ছেলে মেয়ে কেউই ঈদ ছাড়া বাড়ি আসেনা। খালার সাথে দুই মিনিট কথা বলার পর বলার মত আর কোন কথা খুঁজে পাওয়া যায়না। তাছাড়া খালুও তার মত মিতভাষী। প্রতিবার দেখলে সেই একই কথা-কখন এসেছো বাড়ি? কখন যাবে ঢাকা? অনিক প্রতিবার একই উত্তর দেয়। কয়েকদিন আগে এসেছি,কয়েকদিন পর যাবো।

সেই কয়েকদিনের ব্যাপ্তি কখনো কখনো মাসও ছাড়িয়ে যায়।

 

 

অনিক কিছু বিরক্তিকর সময় কাটানোর মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে বাসা থেকে বের হল। তার বাসা থেকে শহরের মূল রাস্তা পর্‍যন্ত গলিটা বেশ চুপচাপ। গলির দুই পাশে একতলা-দুইতলা-তিনতলা অনেকগুলি বসত বাড়ি। একটাই কেবল পাঁচ তলা বিল্ডিং। অনিক জম্মের পর থেকেই এই এলাকায় বড় হয়েছে। এই গলির প্রতিটা বাড়ি,প্রতিটা গাছ, এমনকি প্রতিটা ইটও তার চেনা। গলিতে আসা যাওয়া করা মানুষগুলো প্রায় সবাই তার পরিচিত। তবু অনিক খুব একটা কথা বলেনা কারো সাথে। ছোটবেলা থেকেই তার এই অভ্যেস। নিজ থেকে যেচে কারো সাথে কথা বলা,ভাব করা,কুশলাদি বিনিময় করা এইসব তার ধাতে নেই। তারপরো বলতে গেলে পাড়া প্রতিবেশী সবাই তাকে বেশ পছন্দ করে। হয়তো ভালো ছাত্র একারণেই। এই গলিটা প্রায় আধ কিলো লম্বা। মাঝে কয়েকটা বাঁক। রাস্তায় পৌঁছতে পাঁচ মিনিট মত লাগে। প্রতিদিন এই পাঁচ মিনিটে অনিকের অনেক পূর্ব পরিচিতের সাথে দেখা হয়ে যায়। সমবয়সীদের কেউ কেউ নিজ থেকে তার সাথে কথা বলে। অনিক জবাব দেয়। কথা কম বললেও অনিকের চোখ কাউকে এড়িয়ে যায়না। গলির মোড়ে মোড়ে কয়েকবছর আগে দেখা বালকগুলোকে কিশোর অবস্থায় দেখে অনিকের বেশ মজা লাগে। কৈশোরেই তাদের মধ্যে যুবক যুবক ভাব লক্ষ্য করা যায়। চোখে চশমা নিয়ে,শার্টের কলার উঁচিয়ে,বাইক নিয়ে ওরা ঘোরাঘুরি করে। সবাই মোটামুটি ভালো ঘরের ছেলে-একটু ড্যামকেয়ার,তবে কেউই বখাটে না। এদের মধ্যে কেউ তার বন্ধুর ছোট ভাই,কেউ তার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। ওরা অনিককে দেখলে ইতস্তত বোধ করে। কেউ কেউ সালাম দেয়। অনিক জবাবে হাসে।

 

বার্ধ্যক্যে উপনীত সকালের মৃদু রোদে-গাছের আবছায়ায়-পাখিদের ডাকে গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনিকের বিরক্তি কেটে যায়। মফস্বলের পরিবেশটাই অনিকের মন ভালো করে দেয় সবসময়। গ্রামের ফ্লেভার মাখা ছোট ছোট সৌন্দর্য আর সেন্টিমেন্টাল মানুষ দিয়ে পরিপূর্ণ মফস্বলের স্বকীয়তা কানায় কানায় উপভোগ করে অনিকের সেনসিটিভ হৃদয়। মন ভালো হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে অনিক এক মুরুব্বীকে দেখে নিজ থেকেই সালাম দিল। রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটা ছেলের সাথেও সে নিজ থেকে হাসি বিনিময় করল।

অনিক গলি ছেড়ে রাস্তার একপাশে রিকশার জন্য দাঁড়ালো। এই অফিস আওয়ারে রিকশা পেতে একটু সময় লাগে। রাস্তার দুইপাশে অনেক প্রতিদ্বন্দী দাঁড়িয়ে থাকে। মিনিট দুয়েক বাদে একটা খালি রিকশা দেখে অনিক হাঁক দিল-এই খালি।

ঠিক একই সময়ে রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে আসা এক মেয়েলী কন্ঠের একই শব্দগুচ্ছের উচ্চারণ তার আহবানের সাথে অনুনাদ সৃষ্টি করল। অনিক তার প্রতিদ্বন্দীর দিকে তাকাল। কিছুটা চেনা চেনা মনে হলেও ঠিক চিনতে পারলনা সে। সাদা কলেজ এপ্রন আর বেমানান রকম বড় সানগ্লাস পড়া সতের আঠার বছর বয়সী চোখ ধাঁধানো সুন্দরী মেয়েটা বয়সের সাথে বেমানান এক্সট্রা কিছু গাম্ভীর্য মুখে মেখে অনিককে পরাজিত করে রিকশায় উঠে গেল। অনিক মেয়েটাকে নিশ্চিতভাবে চিনতে না পারলেও এটা সম্পূর্ণ নিশ্চিত হল যে মেয়েটাকে সে সহজে ভুলতে পারবেনা। বাইশ বছরের জীবনে এমন চুম্বক প্রকৃতির মেয়ে সে কমই দেখেছে। কারণ মেয়েটি তাকে লোহা বানিয়ে ঠিক চুম্বকের মতই টানতে শুরু করেছে। কে এই চুম্বকিনী?

 

৩.

 

 

‘কিরে তোর মন খারাপ নাকি? গম্ভীর গম্ভীর লাগছে কেমন…’

কয়েক তারকা বিশিষ্ট অনেকগুলো জাঁকজমকপূর্ণ হোটেলের চোখ রাঙ্গানি উপেক্ষা করে,সৈকতের প্রান্তে ঝাউবনের ফাঁকে বেঁচে থাকা-অস্থায়ী চায়ের দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অনিকের দিকে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল আতিক। সাথে উড়িয়ে দিল কিছু নিকোটিনজাত ধোঁয়া।

 

‘হুম…হুম…ঠিক ঠিক…’

এই ক্ষেত্রে আসিফও আতিকের সাথে সহমত পোষণ করল। এবং মুখ ভর্তি ধোঁয়া ছেড়ে আতিকের ধোঁয়া কাটানোর চেষ্টা করল। ধোঁয়া দিয়ে কাটাকাটি খেলা এই দুই তরুণের প্রিয় কাজ।

 

‘আরে না,এমনি…প্রতিদিন একই জায়গায় আড্ডা দিতে দিতে মনে হয় বিরক্তি চলে এসেছে।’

অনিক তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। আসিফ ও আতিক তাদের বন্ধুর চাপা স্বভাবের সাথে পরিচিত। ওরা বেশ ভালো করেই জানে অনিক বলতে না চাইলে আসল কথাটা কিছুতেই বের করা যাবেনা। কিছু বলার থাকলে সে নিজ থেকেই বলবে। তাই তারা এই বিষয়ে আর কথা বাড়ালনা। চা-সিগারেট খেয়ে তিনজন হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের দিকে এগোতে লাগল। সৈকতে ছাতা দিয়ে যেসব চেয়ার ঢাকা থাকে সেগুলোতে বসে সূর্য ডোবা দেখতে তাদের দারুণ লাগে। আর একটু পরেই সূর্য ডুববে।

 

চেয়ারে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়ার পর আসিফ আর আতিক মোবাইল ফোনে প্রেমালাপে ব্যস্ত হয়ে গেল। অনিক বন্ধুদের অবস্থা দেখে হাসে। সে বেশ ভালো আছে। যখন তখন দূরে গিয়ে প্রেমিকার সাথে কুটকুট করে কথা বলতে হয় না,ডেটিং এর খরচ জমাতে,ফোনের কার্ড কিনতে বন্ধুদের সাথে কিপটেমি করতে হয়না। অবশ্যি মাঝে মাঝে যে বেশ একা লাগেনা তা না। বিশেষ করে নববর্ষ,ভালোবাসা দিবস এই উৎসব গুলোতে যখন বন্ধুরা তাদের দেবীর সাথে ঘুরে বেড়ায়,ফেসবুকে ছবি শেয়ার করে কিংবা যখন গভীর রাতে আচানক ঘুম দেবীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়,তখন তারো মনে হয় কেউ একজন থাকলে খারাপ হতোনা। সমুদ্রের জোয়ারের মতই এই চিন্তাগুলো বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়না। আচ্ছা তার কি কাউকে ভালো লাগে? সকালে দেখা চুম্বকিনীর কথা অনিকের আবার মনে পড়ে যায়। সকাল থেকে অন্তত পঞ্চাশ বার সে মেয়েটির কথা ভেবেছে। আচ্ছা সে কি চুম্বকিনীর প্রেমে পড়েছে? নাহলে একটু পর পর মেয়েটার মুখ তার চোখে ভাসছে কী কারণে? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায়না সে। তবে মেয়েটিকে পুনরায় দেখার একটা তাগাদা অনুভব করে সে মনের মাঝে। আসিফের বাসা তার বাসার পাশের গলিতেই। আসিফ কি চিনবে মেয়েটিকে? আসিফকে কি বলে দেখবে সে? নাহ থাক। আসিফ কে বলা আর শহরের প্রাণকেন্দ্র বাজারঘাটার বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপন দেয়া একই কথা। বিজ্ঞাপনের সাথে মাইকিংটাও আসিফ ফ্রিতে করে দিবে। এখন না। বলতে হলে আরো পরে বলা যাবে। এখন বললে অহেতুক ঝামেলা বাড়ানো হবে।

 

৪.

 

গতকাল ছিল অন্তিকার আঠারতম জম্মদিন। আর দশটা তরুণীর মত জম্মদিন তার মনে বিশেষ কোন আনন্দ নিয়ে আসেনা। বন্ধু-বান্ধব কিংবা আত্নীয় স্বজন মিলে ঘটা করে পালন করা তো দূরে থাক,পারিবারিক ভাবেও দিনটি কখনো পালন করা হয়না। জম্মদিনগুলোতে সে তার অসহায়ত্ব আরো প্রকটভাবে অনুভব করে। আসলে জম্মদিনকে তার অনেকটা বিদ্রুপের মতই মনে হয়। শেষ কবে জম্মদিনের কেক কেটেছিলো তা মনে করার চেষ্টা করে সে। ছাদের উপর প্রিয় দোলনাটাতে বসে দুলতে দুলতে আর্দ্র চোখে অন্তিকার মনে পড়ে বাবা বেঁচে থাকতে অর্থাৎ সেই আট বছর আগে সে সর্বশেষ জম্মদিনের কেকটা কেটেছিলো। রোড এক্সিডেন্টে বাবা মরে গেলেও,বেঁচে যায় সে আর তার মা। তবে অন্তিকা এই বেঁচে থাকা মেনে নিতে পারেনা,তার বার বার মনে হয়-ঐ দিন বাবার সাথে মরে গেলেই ভালো হত। এটা ভাবাই স্বাভাবিক যে বাবার মৃত্যু পরবর্তী আটটা বছর সে তার মাকে অবলম্বন করে বেঁচেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই আট বছর ধরে অন্তিকা তার মাকে শুধু ঘৃণাই করেছে। বাবার মৃত্যুর পর মা আর কোন বিয়ে করেনি ঠিক,কিন্তু যা করেছে এবং করে চলছে…অন্তিকা এইসব কথা ভাবতে চায়না,সে আর দশটা স্বাভাবিক মেয়ের মতই নিজের মা’কে ভালোবাসতে চায়। কিন্তু ভালোবাসা জিনিসটা তো শুধু রক্তের না,আরো অনেক কিছুই জড়িত থাকে এর সাথে। তাই সে পারেনা,চাইলেও পারেনা।

 

অন্তিকার প্রায়ই সেই সময়গুলোর কথা মনে পড়ে-যখন বাবা বেঁচে ছিল। কী সুখের সময়ই না ছিল সেগুলো। বেশি কিছু তার মনে নেই,কিন্তু যেটুকু মনে আছে সেইসব স্মৃতিই সে বার বার জাবর কাটে। বাবা বেঁচে থাকলে তার জীবনটা নিঃসন্দেহে অন্যরকম হতো। রাতের পর রাত তার কাঁদতে হতো না,জাগতে হতোনা;বাড়ির বাইরে বেরোলে লোকজনের কটু কথা শুনতে হতো না,স্কুল থেকেই সহপাঠিদের কাছে ‘অবাঞ্চিত’ হতো না,অন্তত ‘নষ্ট মেয়ে’ এই অপবাদটা তার গায়ে লাগতনা। অন্তিকার চোখ যেন আরো ভারী হয়ে যায় জলে। সে তো তার চরিত্রে দাগ লাগার মত কিছু করেনি;কেন মায়ের অপকর্মের কুৎসিত কালো রঙ তার গায়েও লাগবে?

 

রাত গভীর হয়,অন্তিকার দীর্ঘশ্বাস আরো গভীর হয়ে বাতাসে মিশে। চাঁদের হাসিকেও যেন অসহ্য লাগে তার কাছে। ছাদের ফুলগুলোকেও অসহ্য লাগে। আরো অসহ্য লাগে মায়ের রুম থেকে ভেসে আসা হাসি ঠাট্টার শব্দগুলোকে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তার অসম্ভব রুপবতী মায়ের এই নতুন রুপ দেখেছে সে। প্রথমজন ছিল শরীফ আংকেল। বাবার বেস্ট ফ্রেন্ড। তার সাথে মায়ের ঘনিষ্টতা ছিল বছর দুয়েক। তারপর ছিল মঈন আংকেল। উনিও বেশি দিন টিকেননি। তারপর আশরাফ আংকেল,রুপম আংকেল,কালাম আংকেল আরো কত কেউ। এই কথাগুলো শুধু অন্তিকা না,এই এলাকার সবাই জানে। একবার স্থানীয় একটা পত্রিকায়ও এসেছিল তার মায়ের এই অবৈধ সম্পর্কের খবরগুলো।

 

এসব কথা ভাবতে ভাবতে অন্তিকা আবারো অনুভব করে সে একা। খুব একা। তার কোন বন্ধু নেই,ভালোবাসার মানুষ নেই। হাহ,ভালোবাসা! অন্তিকা জানে সব ছেলে শুধু একটা জিনিসই চায় তার মত’নষ্ট’পরিবারের মেয়ের কাছে। স্কুলে আসা যাওয়ার পথে,কলেজে আসা যাওয়ার পথে শুধু এক ইংগিতই সে পেয়েছে। বহু ছেলে দেখেছে সে। তাদের দৃষ্টিতে কখনো প্রেম ছিলনা…

কাঁদতে কাঁদতে খুব ক্লান্ত হয়ে গেলে অন্তিকা ছাদ থেকে নিজের রুমে আসে। তার বন্ধু নেই এটা বোধহয় সম্পূর্ণ ঠিক না। অন্তিকা বুক শেলফ থেকে একটা বই নিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে। এই বই-ই তার জীবনের সব। কখনো কখনো যে তার মুখে দুর্লভ হাসি ফুটে,কেবল মাত্র এই বইগুলোর জন্যেই। অন্তিকার আপনজন বলতে আছে কেবল ঐ বইগুলোই।

বই পড়তে পড়তে কখন যে চোখ জোড়া লেগে আসে অন্তিকার খেয়াল থাকেনা।

 

 

৫.

 

সূর্যের কোমল আলোর এলার্ম অন্তিকার ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিল। সাতটা ত্রিশ বাজে। নয়টায় কলেজ। রাতের অন্তিকা আর দিনের অন্তিকার মাঝে আকাশ-পাতাল ফারাক। দিনে সে ব্যস্ত সময় কাটায়। কলেযে আর প্রাইভেট টিউটরদের কাছে যাওয়া আসা করতে করতেই তার সময় কেটে যায়। অন্তিকা ঠিক করল প্রথম ক্লাসটা সে করবেনা। তাই নয়টার পর বের হবে বাসা থেকে। টেবিলের উপর হলুদ একটা খাম দেখতে পেল সে। অন্তিকার মা শারমিন মাসের শুরুতেই হলুদ খামের মাঝে কিছু টাকা অন্তিকার টেবিলে রেখে যায়। টাকার পরিমাণ সবসময় অন্তিকার প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি। টাকা দেয়ার এই পদ্ধতির কারণ-অন্তিকা কখনো তার মায়ের কাছে টাকা চায়না।শুধু টাকা না,কোন কিছুই সে দাবী করেনা মায়ের কাছে। আজ প্রায় তিন বছর সে তার মায়ের সাথে কথা কোন কথা বলেনা।

 

অন্তিকা খামটা নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দিল। বাবা মারা যাওয়ার পরও তাদের কখনো টাকার সমস্যা হয়নি। অন্তিকা আর তার মায়ের জন্য অন্তিকার বাবা ইলিয়াস সাহেব দুইটা পাঁচ তলা বাড়ি রেখে গেছেন। এক মাসের ভাড়ার টাকাতেই তাদের ছয় মাস চলে যায়। বাকীগুলো কেবল শারমিনের খামখেয়াল মেটায় আর ব্যাংকের পেট মোটা করে।

 

মা টেবিলে নাস্তা করছিল তাই মায়ের সাথে সাক্ষাত এড়ানোর জন্য অন্তিকা নাস্তা না করেই বেরিয়ে পড়ে। মাথায় হালকা করে ঘোমটা টেনে সানগ্লাসটা চোখে পরে নেয় সে। আজ বেশ গরম পড়েছে,বিশ্রী রোদ। বাসা থেকে বের হয়েই রিকশা পেয়ে গেলে স্বস্তি বোধ করে সে। রিকশার জন্য রাস্তার পাশে অপেক্ষা করতে খুব খারাপ লাগে তার। অনেকেই কেমন যেন অন্যরকম চোখে তার দিকে তাকায়। অনেকেই হয়তো মুখ টিপে হাসে।

 

পাঁচ মিনিট ধরে অন্তিকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়টাতে যেন রিকশার দুর্ভিক্ষ চলে। একটা রিকশাও খালি দেখা যাচ্ছেনা। সে দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। এরই মাঝে বিপরীত দিক থেকে এক ছেলেকে আসতে দেখল সে। তার চাইতে কয়েক বছর বড় হবে। অন্তিকা আড় চোখে ছেলেটার দিকে তাকায়। বেশ লম্বা আর একটু স্বাস্থ্যবান। শ্যামলা গায়ের রঙ,মাথায় কোঁকড়া চুল। ছেলেটাকে দেখে কেমন যেন চেনা চেনা লাগল তার। আগে কোথায় যেন দেখেছে। সে যেই গলির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটি ঠিক তার বিপরীত দিকের গলির মাথায় দাঁড়িয়ে। তাদের মাঝখানে নদীর মত রাস্তা।

 

এই খালি-বলে ডাক দিল অন্তিকা।

অন্তিকা শুনতে পেল ছেলেটিও ঠিক তার সাথে রিকশাটা ডেকেছে। দুইজন যাত্রী একই সাথে ডাকলেও রিকশাওয়ালা ভোট দিল অন্তিকার পক্ষেই। রিকশাওয়ালাদের বোধহয় এটাই নিয়ম।’লেডিস ফার্স্ট’কথাটা তারাই সবচেয়ে বেশি মেনে চলে। রিকশায় যেতে যেতে অন্তিকার মনে পড়ল ছেলেটার নাম অনিক। অনিক ভাইয়া আর সে একই স্কুলে পড়েছিল। একবার একই বেঞ্চে বসে তারা কোন একটা বার্ষিকী পরীক্ষা দিয়েছিল। আর হ্যাঁ, ঐ পরীক্ষার পর অনিক ভাইয়া তাকে আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। আচ্ছা,অনিক ভাইয়া কি তাকে চিনতে পেরেছে? নাহ,চেনার কথা না। কত আগের কথা!

 

 

৬.

 

অনিক love at first sight এ বিশ্বাস করেনা। মেয়েটাকে সে ভালোবেসে ফেলেছে এটাও ঠিক মানতে পারছেনা সে,আবার সারাক্ষণ যে একটা চিনচিনে বেদনা অনুভব করছে,সেটাও বাতিল করে দিতে পারছেনা। যাই হোক,আগে মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে। বাকিটা পরে দেখা যাবে। অনিক আপাতত এটাই মনস্থির করল। সে লাজ লজ্জ্বার মাথা খেয়ে সকালের সময়টাতে বেশ কয়েকবার রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল-মেয়েটাকে দেখার আশায়। পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলেগুলো বেশ সন্দেহের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়েছিল,আসিফও একদিন তাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডিটেকটিভের মত জেরা করল। অনিক নিজেও এরকম অড টাইমে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বেশ বিব্রত বোধ করেছে। যে ছেলেগুলো সারাক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে তাদের নিয়ে কারো যেন মাথাব্যথা নেই,শুধু সে কয়েকদিন দাঁড়িয়েছে আর সবার চোখে পড়ে গেছে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলনা,যার জন্য এত লজ্জ্বা-ভঙ্গ তারই কোন দেখা মিলল না।

 

‘বুঝলি  আতিক,অনিক আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছে। প্রায়ই রাস্তার মোড়ে একা দাঁড়িয়ে থাকে।’

 

সার্কিট হাউজের পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে বাদাম চিবুতে চিবুতে আসিফ উস্কানিমূলক উক্তিটি ছুঁড়ে দিল। এই জায়গাটা তাদের পছন্দের তালিকায় দ্বিতীয়। সী-বীচের পরে সবচেয়ে বেশি তারা এখানেই আড্ডা দেয়। চমতকার একটা জায়গা। ঢালু আর ফনা তোলা সাপের পিঠের মত বাঁকানো পিচ বাঁধানো রাস্তা বেয়ে উপড়ে উঠতে হয়। পাহাড়ের উপর সরকারি অতিথিশালা-সার্কিট হাউজ বাংলো। তার পাশেই উঁচু ঘাসের বেদির উপর একটা বৌদ্ধ মন্দির। এই পাহাড়ের উপর আর আছে একটা রাডার। রাডারটা গোলকাকৃতির বহুভূজ। তবু অনিকরা ছোটবেলায় ভাবত-এটাই পৃথিবীর সবচাইতে বড় ফুটবল! এই জায়গা তাদের এত ভালো লাগার কারণ এখান থেকে সরাসরি সমুদ্র দেখা যায়। সমুদ্রের পাশের ঝাউবনকে মনে হয় সবুজ একটা পুরু দেয়াল। পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের সাথে লজ্জ্বায় রক্তিম সূর্যের মিলনে দেখতে দারুণ লাগে তাদের।

অনিক পাহাড়ের উপর বাঁধানো ঘাটে বসে মোবাইলে গেইম খেলছিল। আসিফের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে একবার তার দিকে তাকাল সে।

 

‘হুম,বুঝি বুঝি;সবই বয়সের দোষ। আমিও জিনিসগুলা খুব মিস করিরে,সিংগেল থাকায় শালার ভাল,কত অপরচুনিটি থাকে।’

আতিকের গলা দিয়ে বৃষ্টির মত আফসোস ঝরে পড়ে।

 

অনিক কোন মন্তব্য না করে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে মুগ্ধ চোখে সমুদ্রের মুখোমুখি দাঁড়াল। একটু পরেই সূর্য ডুববে আর তাদেরও এই পাহাড়ের উপর আড্ডার সময় শেষ হবে। সন্ধ্যার পর এই জায়গা খুব একটা নিরাপদ না। বিশেষ করে ডেটিংয়ে আসা যুগলদের জন্য। সমুদ্রের দিকে মুখ করে ওরা তিনজনই হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেল। কখনো কখনো এমনটা হয়-আড্ডার মাঝখানে কোন অজানা কারণে যেন সবাই নিরবতা পালন করে কিছুক্ষণের জন্য। এটা হল আড্ডার অঘোষিত বিরতিকাল।

 

সূর্য সাগরে লুকিয়ে যাওয়ার পর ঢালু পথ ধরে নিচে নামতে নামতে অনিক আকস্মিকভাবে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হল,অবচেতনভাবেই ওর পা দু’টো ব্রেক করল। তার প্রায় দশ ফিট সামনে মৃদু পায়ে মাথা নীচু করে যে যে মেয়েটা হাঁটছে তাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে তার। একটা মেয়েকে পেছন থেকে দেখেই চেনা চেনা মনে হওয়ার কোন কারণ নেই। কিন্তু ব্যাখ্যাতীত ভাবে অনিকের কেন যেন মনে হচ্ছে এই মেয়েটাই সেই চুম্বকিনী। অনিকের হঠাৎ এই গতিরোধে আসিফ ও আতিকও থেমে গেল। ‘কিরে কী হল? পায়ে কিছু লাগল নাকি?’ বন্ধুরা তার কাছে জানতে চাইল।

ক্ষণিকের বিরতির পর অনিক আবার হাঁটতে শুর করেছে। ‘না কিছু না,হাঁটতে থাক,পেছন থেকে ডাকবিনা।’ বন্ধুদের এই আদেশ প্রদান করে আর সাথে এক গাদা বিস্ময় উপহার দিয়ে অনিক একটু জোর পায়ে হেঁটে মেয়েটির সামনে চলে এল। এবং মাঝে মাঝে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনার মত সে দেখতে পেল- এই মেয়েটির কাছেই সে ঐদিন রিকশা হারিয়েছিল। এই মেয়েটিই সেই চুম্বকিনী!

 

‘এই যে মেয়ে,একটু কথা বলা যাবে?’

প্রশ্নটা করে আসিফ আর আতিকের চাইতে অনিকই সবচাইতে বেশি অবাক হল। এত সাহস সে কোত্থেকে পাচ্ছে?

 

আকাশে তখনো কিছুটা রক্তিম আলো অবশিষ্ট আছে। অন্তিকা লক্ষ্য করেনি কেউ একজন সামনে এসে প্রায় তার পথ আগলে ধরেছে। সে এই ছোট পাহাড়ের নীচেই এক স্যারের কাছে পড়ে। পড়া শেষ হওয়ার পর মাঝে মাঝে সে এখানে হাঁটতে আসে।

পথের মাঝে এরকম উটকো ঝামেলা দেখে অন্তিকা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। অন্তিকা চিৎকার দিতে যাবে এমন সময় হঠাৎ বাঁধা প্রদানকারী যুবকটির মুখ দেখে দেখে নিজেকে সামলে নিল সে। যুবকটিকে সে চিনে। কিছুদিন আগে তাকে সে দেখেছিল-অনেক বছর পর। সেদিন দূর থেকে চেনা চেনা মনে হচ্ছিল,কিন্তু এখন কাছ থেকে দেখার পর তাকে সম্পূর্ণরুপে চিনতে পারল সে। অন্তিকার ভয় কেটে গেলেও,বিস্ময় ভাবটা কাটলনা। এমন অসময়ে হঠাৎ দেখায় অনিক ভাইয়া তার সাথে কথা বলতে চায় কেন? আর অনিক ভাইয়া কী তাকে ভুলে গেছে? অবশ্য ভুলে যাওয়াই স্বাভাবিক। স্কুল সে তো কবেকার কথা। অন্তিকা সিদ্ধান্ত নিল,সে ও না চেনার ভান করবে।

 

‘কি বলতে চান? একা মেয়ে দেখলেই পথ আগলে বিরক্ত করতে ইচ্ছে করে?’

অন্তিকার এমন কঠিন উত্তরে অনিক অনেকটাই দমে গেল। তার মুখটা যেন তিতকরলায় ভরে গেল হঠাৎ। ধূর কেন যে কথা বলতে গেল,এখন বোধহয় লোক জড়ো করে সিন ক্রিয়েট করবে। অন্তিকা নিজেও বুঝতে পারল উত্তরটা বেশি ঝাঁঝালো হয়ে গেছে। সে তো অনিক ভাইয়াকে চেনে। এত কঠিন হওয়ার দরকার ছিল না।

 

‘না কিছু না, আপনি যান; ভুল হয়ে গেছে। স্যরি’

অনিকের মুখ শুকিয়ে যেন লাকড়ি হয়ে গেছে। বিষাদ আর অপমানে কন্ঠও কিছুটা ভারী হয়ে এসেছে তার। ধূর পৃথিবীটা এত বাজে কেন? পায়ের নীচে একটা গর্ত পেলে এই মুহূর্তে খুব সুবিধা হত অনিকের, টুপ করে ঢুকে যাওয়া যেত।

 

শেষ হয়ে আসা সন্ধ্যার মায়া মায়া আলোয় শুরু হওয়া যুবক-যুবতীর অদ্ভুত কথোপকথনে আতিক আর আসিফের মুখ তখনো হা হয়ে আছে। বাড়ি ফেরা পাখিদের কয়েকটা অনায়াসে তাদের মুখে ঢুকে যেতে পারবে। অন্তিকা অনিকের করুণ চোখের দিকে তাকাল। নাহ একটু বেশিই অপদস্ত করে ফেলেছি-অন্তিকা ভাবল। বেচারা না হয় একটু কথাই বলতে চেয়েছে। আর তার চোখ! হ্যাঁ চোখ! তার দৃষ্টিতে কী যেন আছে। নিষ্পাপ কিছু। খুব সরল কিছু। এমন শুদ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে বহুকাল কেউ তাকায়নি। কলেজের স্যারেরাও না,পাড়ার মৌলানারাও না। অন্তিকা মন গলে গেল। একটু আগে করা অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইল সে।

 

‘ভাইয়া আমি আপনাকে চিনি। আপনি অনিক ভাইয়া। আমার স্কুলেই ছিলেন। আমাকে বোধহয় ভুলে গেছেন। আমি অন্তিকা। ওই যে সেভেন এর লাস্ট টার্মে আপনার সাথে বসে পরীক্ষা দিয়েছিলাম।’

অনিকের মুখের তিতে ভাবটা কেটে গিয়ে মিষ্টি একটা অনুভূতি ফিরে এল। সে যেন এক নিমেষে ফিরে গেল স্কুলের সময়টাতে। কী সব মজার দিনই না ছিল। স্কুলের এক প্রকার সেলিব্রিটিই ছিল সে। সবসময় এত ভালো রেজাল্ট করত যে স্যারেরা তো বটেই,জুনিয়র সিনিয়র ছেলে মেয়ে সবাই তাকে চিনত।

 

‘তুমি অন্তিকা? সেই পিচ্চি অন্তিকা? এত বড় হয়ে গেছো? চেনায় যাচ্ছেনা। তোমার নাম ঠিকই মনে আছে আমার। এমন আনকমন নাম …’

 

যুবক যুবতী কথা বলতে বলতে আবার হাঁটতে শুরু করেছে। তাদের পেছন পেছন হাঁটছে প্রায় বিমূঢ় হয়ে যাওয়া আরো দুই যুবক। পঞ্চাশ সেকেন্ড আগেও অসহ্য বোধ হওয়া পৃথিবীকেই অনিকের এখন মনে হচ্ছে স্বর্গের চাইতে মধুর!

৭.

 

 

গোসল শেষ করে ভেজা চুলে টাওয়াল পেঁচিয়ে বেলকনিতে বসে চা খাওয়া অন্তিকার প্রিয় কাজগুলোর একটি। বাইরে থেকে বাসায় এসে অন্তিকার প্রথমেই এই কাজটা করতে হয়। নাহলে একটুও ফ্রেশ লাগেনা তার। আজ অনেক সময় নিয়ে গোসল সারল সে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে টেবিলের উপর চায়ের কাপ দেখে অন্তিকার মন ফুরফুরে হয়ে গেল। কাজের মেয়েটা অনেকদিন ধরে আছে। মেয়েটা বুঝে অন্তিকার কখন কী দরকার। অন্তিকা বেলকনিতে হাঁটু গেড়ে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সন্ধ্যার দিকে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনাটা নিয়ে ভাবতে লাগল।

 

নাহ এতটা ফ্রাংক হওয়ার দরকার ছিল না। কী যে হয়ে গেল তখন। অনিক ভাইয়া নিশ্চয় তাকে অনেক সস্তা ভাবছে। নিজ থেকেই হড়বড় করে একগাদা কথা বলে ফেলল। আসলে ছেলেটার অমন করুণ দশা দেখে এত মায়া লাগছিল তার। থাক, যা হওয়ার হয়েছে। আর তো দেখা হচ্ছেনা। অবশ্য দেখা হলেও খুব একটা খারাপ হত না। ভাইয়াকে মোটেও খারাপ লাগেনি তার। সহজ-সরল ছেলে। আর সে যে একাই কথা বলেছে তা তো না,ভাইয়াও তো অনেক কথা বলল। আর একটা জিনিস অন্তিকার খুব ভালো লেগেছে। অনিকের চোখের সংযম,তাকানোর ভঙ্গি। যতক্ষণ হেঁটেছে একসাথে মাথা নিচু করে ছিল। আজকালকার ছেলেরা এতটা লাজুক হয় না। আর আসার সময় যখন তাকিয়েছে সেটাও কত পরিচ্ছন্ন। নাহ ছেলেটা মোটেও খারাপ না। ফোন নাম্বারও চায়নি আচমকা। আবার আসার সময় নিজ থেকেই রিকশা ঠিক করে দিয়েছে। ফোন নাম্বার নিলেও খারাপ হতনা অবশ্য। তার তো কথা বলার মত কেউ নেই। মাঝে মাঝে কথা বলা যেত। ধূর,কী ভাবছে এইসব সে? নিজের উপরই বিরক্ত হল অন্তিকা। ফোন নাম্বার নিয়ে কী হবে? ছেলেটার নিশ্চয় ঠেকা পড়েনি তার মত ব্রোকেন ফ্যামিলির একটা মেয়ের সাথে এত ভাব করবে। ঢাকা থাকে,ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। কত স্মার্ট মেয়ের সাথেই তো তার ভাব থাকবে। জাস্ট দেখে পরিচিত মনে হয়েছে তাই হয়তো কথা বলতে এসেছে।

 

অন্তিকা আর বেশি কিছু ভাবতে চায় না। ভাল একটা ভার্সিটিতে পড়ে,ভাল ফিউচার,দেখতে ভালো,ফ্যামিলি ভালো-এরকম ভালো একটা ছেলে কখনো তাকে নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করবেনা। একা দেখে কথা বলতে ইচ্ছে হয়েছিল তাই কথা বলেছে। আর দেখা হবেনা,কথাও হবেনা। অন্তিকা নিজেকে প্রবোধ দিয়ে ফিজিক্স বইটা নিয়ে বসল। কাল একটা পরীক্ষা আছে স্যারের বাসায়। গতবার হাফ মার্কের জন্য হাইয়েস্ট মার্ক মিস হয়ে গেছে। এবার মিস করা চলবেনা। এইসব অলস ভাবনায় সময় নষ্ট না করে তার উচিত পড়ার দিকে মন দেয়া।

 

পড়া শেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট দেখে চমকে গেল অন্তিকা। অনিক সাথে একটা মেসেজও দিয়েছে। ‘অন্তর্জালে বন্ধু হলে কি ব্যাপারটা কি খুব খারাপ হবে?’ নাহ,এই জিনিসটাকে আর প্রশ্রয় দেয়া যাবেনা। এই ছেলে কয়দিনের ছুটি কাটাতে আসে তাই হয়তো তার মায়ের কথা জানেনা। জানলে লেজ তুলে পালাবে,বন্ধু হওয়া দূরে থাক,সামনেই পড়তে চাইবেনা।

 

৮.

 

 

একটা বাগান। বাগান জুড়ে শুধু শাদা ফুল। গোলাপ আছে,বেলী আছে,শিউলী আছে। সাদা টিউলিপও আছে। আচ্ছা টিউলিপ কী সাদা হয়? হতে পারে। না হলে বাগানে কোত্থেকে আসল। আশ্চর্য! বাগানের ঘাসও সাদা। অনিকের গায়ের শার্ট,প্যান্ট সবই সাদা। অনিক সাদা ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফুল ছিঁড়ছে। ফুলগুলো একটা চারকোণা কাগজের বাক্সে জমাচ্ছে সে। হঠাৎ করে কোত্থেকে যেন এক দল সাদা রাজহাঁস তার দিকে তেড়ে আসতে লাগল। অনিক শৈশব থেকেই রাজহাঁস ভয় পায়। তার ফুপুর বাসায় এরকম অনেকগুলো রাজহাঁস ছিল। রাজহাঁস দেখলে অনিকের সাপ দেখার মতই একটা শিরশিরে ভয় হয়। অনিক আতংকিত হয়ে ফুল ফেলে দিয়ে দৌঁড়াতে লাগল। প্রচন্ড জোরে ছুটছে সে। হঠাৎ মোজার্টের কোন সিম্ফোনির মত স্নিগ্ধ হাসির শব্দে সে দৌঁড় থামিয়ে পাশে ফিরে তাকাল। অন্তিকা সাদা জামদানী পরে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সবই সাদা শুধু অন্তিকার ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। ‘আমার ফুল কয়? হাঁসের ভয়ে সব ফুল ফেলে দিলে?’এই বলে আবারো হাসিতে ভেঙে পড়ল সে।

 

অন্তিকার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগেই অনিকের ঘুম ভেঙ্গে গেল। কয়দিন ধরে গরম পড়ছে খুব। বিদ্যুৎ নেই। আই,পি,এস এও কাভার করেনা-এত লোডশেডিং। অনিক ঘেমে একাকার। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। ভোর পাঁচটা বেজে সাত মিনিট। বাইরে এখনো অন্ধকার।সে ঘুমিয়েছে বেশিক্ষণ হয়নি। ঘন্টা দু’য়েক হয়েছে। অনিক শোয়া থেকে উঠে বসল। এখনো অন্তিকার হাসির শব্দটা তার কানে বাজছে। এত জীবন্ত স্বপ্ন! আর এত অসম্ভব রকম সুন্দর! অনিক বুকের মাঝে ভীষণ এক শূণ্যতা অনুভব করল। এরকম অনুভূতি তার আগে কখনো হয়নি। এই সূর্য উঠার আগ মুহূর্তে অনিকের হঠাৎ অন্তিকাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। খুউব। সাদা শাড়িতে না হোক,কোনভাবে এক পলক দেখলেই হল। এমন লাগছে কেন তার? গলায় কী যেন আটকে যাচ্ছে বার বার,ভারী হয়ে আসছে গলা। আর দমটাও যেন বন্ধ হয়ে আসছে। নাহ,মেয়েটাকে আবার না দেখলে সে দম বন্ধ হয়ে মারাই যাবে। মেয়েটাকে তার দেখতেই হবে,যেভাবেই হোক,যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।

অনিক নিজেকে বেশ শক্ত নিরাবেগ মানুষ বলেই জানত। হঠাৎ করে জেগে উঠা অনুভূতিগুলোর সাথে সে একদমই পরিচিত না। অনিক কী করবে বুঝতে পারলনা। সমীকরণগুলো এত দ্রুত পালটে যাচ্ছে কেন? অনিক চোখ বন্ধ করে যেন আবারো স্বপ্নটা দেখার চেষ্টা করল। ক্রিকেটের মত স্বপ্নকেও রিপ্লে করা গেলে বেশ হত!

 

অনিক বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। এখন আর ঘুম আসবেনা। বিদ্যুৎ চলে এসেছে। অনিক ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিল। ঘাম শুকোতে শুরু করেছে। সে তার ডায়েরী খুলে লিখতে বসল। বুকটা একটু হালকা করা দরকার। অনিক তার অনুভূতিগুলোর কিছুই লিখতে পারলনা। শুধু কাঁচা হাতে কয়েক লাইন কবিতা লিখে ফেলল সে-

 

আমি কিংবদন্তী হতে চাই না, হতে চাইনা কোন দিগ্বিজয়ী সৈনিক-

জানি ভালোবাসা যতটা সত্য, ঠিক ততটাই কাল্পনিক;

তবু তোমার জন্য আমি হব একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ প্রেমিক!

 

অনিক ফেসবুকে লগইন করে দেখল অন্তিকা তার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেছে নাকি। নাহ এখনো করেনি। অভিমানে অনিকের গলা আবারো ভারি হয়ে এল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো সে। তখন আকাশ ভেদ করে ভোরের আলো ফুটেছে। চারদিক ঝলমল করছে নতুন দিনের আনন্দে। সব যেন সূর্যালোকে কানায় কানায় পূর্ণ,শুধু অনিকের মনে কী এক না পাওয়ার ব্যথা।

অনিক ডায়েরীর উপর মাথা রেখে অন্তিকাকে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল। এবং মনের আনন্দে স্বপ্নটা সে আবারো দেখল!

 

 

৯.

 

ঐ সন্ধ্যার প্রায় দুই সপ্তাহ পর বন্ধুদের জেরার মুখে অনিক হার স্বীকার করতে বাধ্য হল। রিমান্ডে পরাজিত অপরাধীর মত অনিক মেনে নিল যে ঐ মেয়েটার প্রতি তার একটু ‘অন্যরকম ভালো লাগা’কাজ করছে।

 

‘ইয়াহু! হিপ হিপ হুররে!’

 

আতিক,আসিফ আর ইমরানের হর্ষধবনি শুনে মনে হলো বাংলাদেশ এইমাত্র বিশ্বকাপ জিতেছে,সাকিব ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট হয়েছে। ইমরান কাল ঢাকা থেকে এসেছে। একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে সে। সেমিস্টার শেষ করে বাস ধরে সোজা বাড়ি চলে এসেছে। কক্সবাজারের ছেলেরা এমনই। সমুদ্রের টান উপেক্ষা করে বাইরে কেউ একদিনও বেশি থাকতে রাজি নয়।

 

‘কনগ্রাটস দোস্ত, প্রেমে পড়ছস ওইটাই বড় কথা। ট্রিট দে।’

ইমরানের উৎসাহটা যেন একটু বেশীই। ওরা সবাই মধ্যাহ্নের সমুদ্রের গরম বালির উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে। একটু আগে লোনা পানিতে ডুব দিয়ে এসেছে ছেলেগুলো।

 

‘আরে প্রেমে পড়সি বললাম নাকি? বললাম যে মেয়েটাকে অন্যরকম ভালো লাগে।’

 

‘ঐ একই কথা। ট্রিট দে।’

আসিফ আর আতিকও সম্মতি জানাল।

 

‘আরে কিছুই তো হয়নি। এখনি ট্রিট দিয়ে কী হবে? দুই একদিন চ্যাট আর ফোনে কথা হল শুধু।’

 

‘তাহলে তো কাজ হয়েই গেল। এবার ঠান্ডা মাথায় মেয়েকে পকেটে নিয়ে আয়।’

 

‘আরে এত সোজা না,মেয়েটা কেমন যেন,একটু রিজিড টাইপ। মন খুলে কথা বলেনা। আমাকে বোধহয় তার পছন্দ না’

 

‘আরে ব্যাপার না, প্রথম প্রথম একটু ভাব তো নেবেই। আর পছন্দ না হলে কি ফোন নাম্বার দিল খালি খালি?’

ইমরান তার সুচিন্তিত মতামত জানাল ।

 

বন্ধুকে পরামর্শ দান শেষে ওরা সুইমিং পুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। অনিকের সাথে আসিফ একই রিক্সায় উঠল। অন্য দু’জনের চাইতে আসিফের সাথে তার হৃদ্যতা একটু বেশি। আসিফের কাছে কিছুই লুকোতে পারেনা সে।

আসিফ এই সুযোগটাই নিল-‘সত্যি করে বল তো, ভালবেসে ফেলেছিস না?’

 

অনিক অস্বীকার করতে পারল না এবার-‘হুম, দিনরাত ওকেই ভাবি’

 

‘আচ্ছা,মেয়েটার নাম কী রে? কোথায় থাকে? তুই কী আগে থেকেই চিনতি?’ একসাথে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করল আসিফ।

 

‘আরে হ্যাঁ,তুই ও চিনবি। ঐ যে অন্তিকা ছিল না? আমাদের জুনিয়র? আমাদের সামনের গলিটাতে থাকত। ঐ মেয়েটাই’

অনিকের উত্তর শুনে আসিফ যেন একটা ২২০ ভোল্টের শক খেল।

‘কোন অন্তিকা? ইলিয়াস আংকেলের মেয়ে?’

‘হুম,ঐ অন্তিকাই,আংকেল তো মারা গেছে সাত আট বছর হল’

আসিফ কিছু না বলে গম্ভীর হয়ে গেল। আসিফের মুডের হঠাৎ এই পরিবর্তন অনিকের চোখ এড়াল না।

‘কি ব্যাপার,হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলি যে?’

আসিফ মিনিট দুয়েক চুপ করে রইল। এরপর সে যা বলল,তা শোনার জন্য অনিক মানসিক ভাবে প্রস্তুত ছিল না। অনিকের পানিতে ভেজা নতুন প্রেমে পড়া উদ্ভাসিত মুখ হঠাৎ করে কনক্রিটের মত ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

‘আমি পুলে যাবো না, আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যা’

অনিক বিড়বিড় করে শুধু এই একটা কথাই বলল।

 

 

১০.

 

 

অন্তিকা সার্কিট হাউজের বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। এই জায়গাতেই সেদিন অনিকের সাথে তার নতুন করে পরিচয় হয়েছিল। এই কয়দিনে অনেক কিছু খুব দ্রুত পালটে গেছে। হঠাৎ করে তার জীবনের প্রতি আক্ষেপ বহুগুনে বেড়ে গেছে। এমন কেন হল তার জীবনটা? শুধু তার সাথেই কেন এমন হয়? ইশ বাবা যদি অমনভাবে হারিয়ে না যেত! আজ সে আবারো আরেকজনকে ভালো লাগা মানুষকে হারাবে। তার আর কোন পথ নেই। গত কয়েক রাত অনিকের সাথে তার অনেক কথা হয়েছে মুঠোফোনে। সে চেষ্টা করেও নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। ভেবেছিল শুধু ঐ একবারের দেখাতেই ব্যাপারটা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ওটা ছিল কেবল শুরু। এরপর নেটে অনিকের সাথে তার যোগাযোগ হয়েছে। অনিক একবার ফোন নাম্বার চাইতেই সে দিয়ে দিয়েছে। অথচ সে ভেবে রেখেছিল ফোন নাম্বারটা কিছুতেই তাকে দিবেনা। অন্তিকা খুব ভালো করে বুঝেছে অনিক তাকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবছে। কলেজে আর স্যারের বাসার সামনে বেশ কয়েকবার দেখাও হয়েছে অনিকের সাথে। ব্যাপারটা যে মোটেও কাকতালীয় না এটা বুঝার জন্য গবেষণা করা লাগেনা। অনিক তাকে দেখার জন্যই ছুটির সময় ঐ জায়গাগুলোতে দাঁড়িয়ে থাকে। অন্তিকা ফোনে বেশ কয়েকবার অনিককে তার কথাগুলো বলতে চেয়েছে-তার কুৎসিত পারিবারিক ইতিহাসের কথা। কিন্তু পারেনি। আজ সে বলবে। অনিককে সবকিছু তার বলতেই হবে। এভাবে সে তথ্য লুকিয়ে একটা সহজ সরল ছেলের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যেতে পারেনা। অন্তিকা জানে এই কথাগুলো জানলে অনিক তার দিকে আর ফিরেও তাকাবেনা। না তাকাক। মিথ্যের আশ্রয়ে কাউকে সে কখনোই জড়াতে চায় না। অন্তিকা জানে অনিককে ভুলে যেতে তার খুব কষ্ট হবে;হয়তো পারবেও না ভুলতে।

আচ্ছা এর মধ্যেই অনিক জেনে যায়নি তো? কাল রাতে অনিক ফোন দেয়নি। হয়তো সব জেনে গেছে তাই মোহ কেটে গেছে। এর মাঝে অনিক কয়েকবার দেখা করতে চেয়েছিল। অন্তিকা করেনি। আজ অন্তিকা নিজেই এস,এম,এস করে অনিককে এখানে আসতে বলেছে। এতক্ষণ আসছেনা কেন? হয়তো জেনে গেছে,তাই লোক লজ্জ্বার ভয়ে আর দেখা করতেই আসছেনা।

এইসব বাস্তব সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে ভাবতে অন্তিকা আরো বিষণ্ন বোধ করল। নিজেকে খুব অবাঞ্চিত মনে হচ্ছে তার। রাস্তায় পড়ে থাকা গায়ের ছাল পোড়া নেড়ি কুকুরের মত।

 

অন্তিকা চলে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল,এমন সময় অনিককে দেখতে পেল সে। ঢালু পথ বেয়ে স্বভাবসুলভ ধীর পায়ে হেঁটে আসছে সে। আকাশে তখন সূর্যটা একটু রাগী। তার গায়ের রং ফলের মত পাকতে শুরু করেছে।

অনিকের চোখ নেশাগ্রস্তদের মত লাল দেখাচ্ছে। রাতে কি ঘুমায়নি ছেলেটা? অন্তিকা ভাবল।

 

-কেমন আছ অন্তিকা?

-ভাল। আপনি?

এরই মধ্যেই অনিকের চাপাচাপিতে ভাইয়া বলা বাদ দিতে হয়েছে অন্তিকার।

-আমি? এই তো আছি।

অন্তিকা অনিকের চোখের দিকে তাকাল। সেই অদ্ভুত সারল্য মাখা চাহনি। অন্তিকার বুকে মোচড় দিয়ে উঠল। এই কয়দিন কথা বলাই উচিত হয়নি তার। এই সহজ-সরল ভালো মানুষটা একটু হলেও কষ্ট পাবে তার ভুলের কথা ভেবে। অন্তিকা আর সময় নিতে চাইল না। একটা লম্বা নিঃশাস নিয়ে প্রস্তুত হল সে।

-কিছু কথা বলব বলে আপনাকে এখানে ডেকেছি। কথাগুলো গত কয়েকদিন ধরেই বলতে চাচ্ছিলাম। পারছিলাম না। কিছু কথা থাকে যেগুলো গলা দিয়ে সহজে বেরোতে চায় না,কাঁটার মত আটকে থাকে। কিন্তু আমি অনেক ভেবে দেখলাম কথাগুলো বলা উচিত। আর একটা অনুরোধ করব,যখন আমি কথাগুলো বলব তখন আপনি আমার দিকে তাকাবেন না,কোন প্রশ্নও করবেন না।

-ঠিক আছে। তবে শুধু শুনব না,আমিও কিছু বলব। তো আগে কে বলবে-তুমি না আমি?

অনিকের পুকুরের জলের মত শান্ত গলা শুনে অন্তিকা বেশ অবাক হল। এখনো তাহলে কিছু জানেনা ছেলেটা!

-আমিই বলি,আমার কথা শুনার পর আপনার হয়তো বলার কিছু থাকবেনা।

-আচ্ছা ঠিক আছে,তুমিই আগে বলো।

 

অন্তিকা প্রায় ধরা গলায় তার না বলা কথাগুলো বলতে শুরু করল।

‘হয়তো জানেন,আট বছর আগে আমার বাবা মারা যায়। এরপর থেকে খুব কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। মা আর বিয়ে করেন নি,কিন্তু বাবার বন্ধু থেকে শুরু করে…’

অন্তিকার গলাটা ধরে আসে আর অনিক তখনই তাকে থামিয়ে দেয়।

-এই কথাগুলো তো আমি জানি অন্তিকা। আমি তো ভেবেছি তুমি অন্য কিছু বলবে আমাকে। তোমার মা কি করেন না করেন,আর তাকে নিয়ে society কী ভাবছে এগুলো নিয়ে আমি কি করব?

আশ্চর্য শান্ত শোনায় অনিকের গলা।

-জানেন যখন,তখন এসেছেন কেন?মজা দেখতে এসেছেন?বিদ্রুপ করতে এসেছেন?

অন্তিকা তার নিয়তির উপর জমে উঠা রাগ যেন অনিকের উপরে ঝাড়তে থাকে।

অনিক বিচলিত হয় না,বরং হাসে একটু।

-আচ্ছা,তোমার আর কিছু বলার আছে?এবার আমি কি একটু কিছু বলতে পারি?

-না আমার আর কিছু বলার নেই। বলুন আপনি যা খুশী।

-শোনো,তোমাকে এখন যে কথাগুলো বলছি প্রত্যেকটা কথাই সত্যি। এক বিন্দুও মিথ্যে নেই। তোমাকে ওইদিন যখন রিকশা নিতে দেখি,তখন থেকেই আমার কোন একটা অসুখ হয়েছে। তোমাকে ছাড়া আর কিছু আমি ভাবতে পারছিনা। আর ঐ দিন এইখানে তোমার সাথে কথা হওয়ার পর থেকে আমি প্রতিদিন রাতে তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি,ঐ সন্ধ্যার পর থেকে আমার প্রতিটা মুহূর্ত কেটেছে তোমাকে আরেকবার দেখার আশায়। তুমি হয়তো জানোনা,সেদিনের পর থেকে আমি প্রতিটা দিন তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেছি,তোমার রিকশার পিছন পিছন গিয়ে তোমাকে দেখেছি। এই জিনিসটাকে যদি তুমি ভালোবাসা না বলো,তাহলে আমি বলব ভালোবাসা নামক কোন শব্দের অস্তিত্ব নেই পৃথিবীতে। আর হ্যাঁ,আমি তোমার মায়ের ব্যাপারে সবকিছুই জেনেছি। সব জেনেশুনেই আমি কথাগুলো বলছি। সব জেনেশুনে ভেবে চিন্তেই বলছি আমি সারা জীবন তোমার সাথে থাকতে চাই।

খুব ঠান্ডা মাথায় থেমে থেমে কথাগুলো অনিক অন্তিকাকে বলল-অন্তিকার চোখে চোখ রেখে।

 

অন্তিকা এই কথাগুলো শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলনা। তার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। তার মনে হল পৃথিবীটা হঠাৎ পেন্ডুলাম হয়ে দুলছে অথবা কোন সুনামিতে সবকিছু ভেসে যাচ্ছে। সবকিছু জেনেও অনিকের মত একটা ছেলে তাকে ভালোবাসার কথা বলছে? না এটা হতে পারেনা। অন্তিকা নিশ্চয় স্বপ্ন দেখছে। এক্ষুনি তার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। দেখবে সে আবার একা। খুব একা।

অন্তিকা নিজেকে গুছিয়ে নিল। মুহূর্তের মধ্যেই অনেক কিছু ভেবে নিল সে। না,সে স্বার্থপরের মত অনিকের জীবনটা নষ্ট করবেনা। নিজের গায়ে লেগে থাকা আবর্জনায় ছেলেটাকে নোংরা করবেনা। তাকে নিয়ে পরিবার,বন্ধু আর সমাজের কাছে খুব ছোট হয়ে যাবে অনিক। হয়তো বাবা-মার সাথে কোন সম্পর্কই থাকবেনা। অনিক তার চাইতে আরো অনেক ভালো মেয়ে ডিজার্ভ করে। অনেক ভালো মেয়ে।

 

-দেখেন,আপনি যা বলছেন সবই সাময়িক আবেগ থেকে,হয়তো infatuation থেকে। আর আমি আপনাকে নিয়ে ওরকম ভাবিনি। কয়দিন ফোনে কথা বলেছি আর আপনি ভেবেছেন আপনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি? কি ভাবেন? মফস্বলের মেয়েরা এত সস্তা? একটা রিকোয়েস্ট করি আপনাকে? প্লিজ,আর কখনো আমাকে ফোন দিবেন না, যোগাযোগ করবেন না। আসি,ভালো থাকবেন।

 

বুকে পাথর চেপে অবলীলায় একগাদা মিথ্যে বলে গেল অন্তিকা। আর এক মিনিটও দাঁড়াল না সে। তার চোখে যে জল-প্রপাত সৃষ্টি হয়েছে সেটা সে অনিককে দেখতে দিবেনা। কিছুতেই না।

অন্তিকা আর ফিরেই তাকালনা,ফিরে তাকালে দেখতে পেত অনিক নামের প্রথম প্রেমে আসক্ত ছেলেটারও তখন চোখের বাঁধ ভেঙ্গে গেছে।

 

 

১১.

 

আজ আকাশটা মন খারাপের গান গাইছেঃ নীল রঙের ক্যানভাসে মেঘের কালচে ছোপ। সূর্যটাও উঁকি দেয়ার খুব একটা সুযোগ পাচ্ছেনা। বৃষ্টি নামবে বোধহয়। অন্তিকা তার প্রিয় বেলকনিতে বসে সামনের দিকে ঝুঁকে যাওয়া আম গাছের সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখছে। তার চোখে আকাশের নীল কিংবা মেঘ কোনটাই নেই,আছে শুধু নিরেট শূণ্যতা।

 

অন্তিকা ভালো নেই। একদমই ভালো নেই। গত কয়েকদিন সে বাসার বাইরে যায়নি। তার ভয় বাসা থেকে বের হলেই অনিককে দেখতে পাবে,আর ছেলেটাকে দেখলেই তার সব উলট-পালট হয়ে যায়,সে স্থির থাকতে পারেনা। অনিক তার অনুরোধগুলো রেখেছে। ফোনে বা চ্যাটে আর কোন যোগাযোগের চেষ্টা করেনি বটে, কিন্তু অন্তিকা এরপর যতবারই বের হয়েছে-সকালে বা দুপুরে বা বিকেলে-ততবারই বাসার গেট থেকে একটু দূরে অনিককে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। ছেলেটা এই অল্প সময়েই এত ভালোবেসে ফেলল তাকে? সবকিছু জানার পর,অন্তিকার মুখ থেকে এত কিছু শোনার পরও তাকে ভুলতে পারছেনা! আর অন্তিকা এটা কী করল? যে ছেলেটা তাকে এতো বিশুদ্ধভাবে চায়,তাকেই ফিরিয়ে দিল? নাহ,সে যা করেছে ভালোর জন্যই করেছে। ছেলেটারই লাভ হবে আলটিমেটলি। সে উচিত কাজই করেছে।

 

কিন্তু অন্তিকার কেন এমন লাগছে তাহলে? এত অস্থিরতা? তাকে ছাড়া থাকতে অনিকের কষ্ট হবে,এই কথা ভাবতেই কেন কষ্টে তার বুকটাও ফেটে যাচ্ছে? অনিক চলে গেছে,তার সাথে আর কখনো কথা হবেনা,কিছুদিন পর সে ঢাকা চলে যাবে-তখন চাইলেও তাকে রাস্তায় কিংবা বাসার সামনে দেখা যাবেনা,এইসব ভাবলেই কেন চোখের জল আটকাতে পারছেনা সে? এত কম সময়ে কেন ছেলেটার প্রতি এত মায়া পরে গেছে তার? রাতের ঘুমটাও কেড়ে নিয়েছে ছেলেটা। এটাই কি ভালোবাসা নয়? অনিককে সে ফিরিয়ে দিয়েছে,সে আর ফিরবেনা-এই কথাটা ভাবলেই কেন বুকের বামপাশটা অমন মোচড় দিয়ে উঠে? তার আগে কখনো তো এমনটা হয়নি। তাহলে কীভাবে থাকবে সে অনিককে ছাড়া। কেন সে ফিরিয়ে দিল অনিককে? এই দুটো সপ্তাহেই-মাত্র চৌদ্দ দিনেই অনিক তার অস্তিত্বের দখল নিয়ে নিয়েছে। এখন কী করবে সে? অন্তিকা ভেবে কূল পায় না। কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা সে-শুধু চলে লোনা পানিতে বালিশ ভিজিয়ে চলে।

 

‘আপা আজকের পেপার’

কাজের মেয়ের ডাকে একটু চমকে উঠে অন্তিকা। কাজের মেয়েটা তার অবিরাম ক্রন্দনে ফুলে উঠা চোখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। অন্তিকা পত্রিকা হাতে নিয়ে তাকে বিদায় করে দিল। পত্রিকাটা টেবিলে রাখতে রাখতে একটা খবরে তার চোখ আটকে যায়।

‘অবশেষে ক্লাস শুরু হচ্ছে বুয়েটে’

তার মানে অনিক আর বেশিদিন এই শহরে নেই। আজ-কালের মধ্যেই চলে যাবে। আবার যখন আসবে তখন কি তাকে মনে রাখবে? কখন আসবে আবার? এতদিন তাকে না দেখে থাকতে হবে?

 

অন্তিকা আর ভাবতে পারলনা। এই মুহূর্তে অনিককে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তার। খুব বেশি দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। অনিককে একবার দেখতে পারলে জীবনে আর কিছুই চাইবেনা সে।

 

 

১২.

 

তুই কি জানিসসা তোর জন্য কান্না ভোরের ঘাসের ঠোঁটে শিশির হয়ে ছুটে,

জানিস নাকি তুই, ঠিক যখনই ছুঁই, তোর চোখেরই জলে ফুল ওমনিই ফোটে…

 

এই মূহুর্তে গানটার কথাগুলো ঠিক যেন অনিকের মনের কথাই বলছে। কানে হেডফোন ডুবিয়ে গান শুনতে শুনতে অনিক বদ্ধ কাঁচের জানালার বাইরের পাশ চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। বৃষ্টির পানিকে তার মনে হচ্ছে অন্তিকার মতই। দেখা যায়,অথচ হাত বাড়ালেও ধরা যায়না। অনিক আসন্ন দিনগুলোর কথা ভাবল। ক্লাস,ল্যাব আর কুইজের ব্যস্ততার মাঝে কি সে অন্তিকাকে ভুলে থাকতে পারবে? চাইলেই কি পারা যাবে? অসম্ভব! যার ছায়া মন ও মগজে অভেদ হয়ে মিশে গেছে তাকে হাজার চেষ্টাতেও ভুলে থাকা যায় না। অনিকের দীর্ঘশ্বাস আরো ভারী হল। সে ভুল করেছে। মস্ত বড় ভুল করেছে সে অন্তিকাকে ভালোবেসে। বাকী জীবন তার এভাবেই কাটবে-অন্তিকাকে ভুলতে না পারার কষ্টে। প্রিয় একটা কবিতার লাইল মনে পড়ে গেল তার-‘জানে সে যে বহুদিন আগে আমি করেছি কী ভুল, পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমাহীন গাঢ় এক রুপসীর মুখ ভালোবাসে…’

বহুদিন আগে না হোক,কয়েকদিন আগে সে যে ভুল করেছে সারা জীবনেও তার প্রায়শ্চিত্ত হবেনা।

অনিক বাইরের দিকে তাকাল। বৃষ্টির গতি কমে এসেছে। গতি কমছে বাসেরও। প্রথম যাত্রা বিরতিতে পৌঁছে গেছে তারা।

বাকী যাত্রিরা সবাই বাস থেকে নেমে গেলেও অনিক নামলনা;সে বসেই রইল। গালে হাত দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে সে বাইরে তাকাল। আচ্ছা অন্তিকা কি ভাবে তার কথা? সে কি তাকে একটুও পছন্দ করেনা? সত্যিই কি তাকে নিয়ে ওরকম কিছু ভাবেনি সে? তাহলে যে এত কথা বলল ফোনে? আচ্ছা এমনকি হতে পারেনা যে মেয়েটাও তাকে ভালবাসে? ধূর অন্তিকা তো বলেই দিয়েছে বাসেনা। বললেও…বলার সময় তবে মেয়েটার চোখ ছলছল করছিল কেন? অনিক হিসেবগুলো মেলাতে পারেনা,প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পায়না। সমীকরণগুলো জটিল থেকে জটিলতর হয়। সবকিছু ভীষণ এলোমেলো লাগে তার। কখনোবা আবার একটু রাগ হয় মেয়েটার উপর,পরক্ষণেই গভীর আবেগে সব রাগ পানি হয়ে যায়।

 

এরই মাঝে বাস আবার চলতে শুরু করেছে। পাশের সীট দুটোতে বসা কপোত-কপোতী আবারো খুনসুটিতে মেতে উঠেছে। সামনে বসা বৃদ্ধ দম্পতি আবারো দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েছে। বাইরের বৃষ্টি ভেজা আবহাওয়া আর ভেতরের এসির কল্যাণে বাসের ভেতরটা বেশ ঠান্ডা। গায়ে পাতলা কম্বল জড়িয়ে নিলে দারুণ একটা আবেশ হয়। এই আবেশের মাঝে হঠাৎ করে মুঠোফোনে আসা একটা ক্ষুদে বার্তা অনিকের মেলাতে না পারা সমীকরণ গুলো সমাধান করে দিল।

 

অনিক জানে সে এখন কী করবেঃ সে চিৎকার করে বাস থামিয়ে তার ব্যাগ নিয়ে নেমে যাবে এবং বাইরে ঝড়-বৃষ্টি যাই আসুক আর বাড়িতে সাইক্লোন-তুফান-ভূমিকম্প যাই হোক,বিকেলের মধ্যেই সে আবার কক্সবাজার ফিরে যাবে।

কারণ অন্তিকা তাকে লিখে পাঠিয়েছে-‘আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আজ বিকেলে একটু দেখা করতে পারবেন? একসাথেই না হয় বৃষ্টিতে ভিজলাম…’

 

অনিক হাসিমুখে অথচ জল নিমজ্জিত চোখে ধরা গলায় বিকট চিৎকার করে উঠল। যাত্রীরা তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

বাসটা ধীরে ধীরে থামছে।                Image